পিঠের মাঝখানে হঠাৎ চুলকালে মানুষ হাত বাড়ায়, কিংবা কোনো কিছুর সাহায্য নেয়। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে চারপেয়ে গবাদিপশু কী করবে? অস্ট্রিয়ায় একটি গরু লাঠি দিয়ে নিজের পিঠ চুলকে সাধারণ মানুষকে তো বটেই, বিজ্ঞানীদেরও চমকে দিয়েছে। সচরাচর এমন দৃশ্য কার্টুন বা সিনেমায় দেখা গেলেও বাস্তবে তা বিরল।
সুইস ব্রাউন জাতের গরুটির নাম ভেরোনিকা। সে নিজের মুখে লাঠি বা ব্রাশ তুলে নিয়ে পিঠ ও শরীরের এমন জায়গায় চুলকে নেয়, যেখানে স্বাভাবিকভাবে তার পৌঁছনো সম্ভব নয়। এ আচরণই গরুকে নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের ধারণায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, এখন থেকে বিদ্রূপাত্মক অর্থে কাউকে আর ‘গরু’ বলে সম্বোধন করা হবে না।
এক দশক ধরে ভেরোনিকার মালিক লক্ষ্য করে আসছিলেন, সুযোগ পেলেই সে লাঠি কুড়িয়ে নেয়। কখনো মুখে ধরে লাঠির এক প্রান্ত শরীরের ওপরের অংশে ঘষে, আবার কখনো অন্য প্রান্ত দিয়ে নিচের দিকে আলতো চাপ দিয়ে ঘষে নেয়। সম্প্রতি সেই দৃশ্যের একটি ভিডিও ভিয়েনার ভেটেরিনারি মেডিসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী আচরণ বিশেষজ্ঞদের নজরে আসে। ভিডিও দেখেই তারা বুঝে যান, এটি কোনো কাকতালীয় আচরণ নয়, বরং স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত ‘টুল ব্যবহার’।
প্রাণী গবেষকদের দাবি, পোষা গরুর ক্ষেত্রে এটি টুল ব্যবহারের প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণিত উদাহরণ। জীববিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজি’তে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক আন্তোনিও হে. ওসুনা-মাস্কারো বলছেন, পৃথিবীতে প্রায় দেড়শ কোটি গরু রয়েছে। আর মানুষ অন্তত ১০ হাজার বছর ধরে তাদের সঙ্গে বসবাস করছে। অথচ এতদিন পর্যন্ত গরুর এমন সক্ষমতা আমাদের নজর এড়িয়েছে, বিষয়টি সত্যিই বিস্ময়কর।

গবেষণার প্রধান লেখক আন্তোনিও জে. ওসুনা-মাসকারো বুদ্ধিমান গাভী ভেরোনিকার সঙ্গে ক্যামেরায় পোজ দিয়েছেন। ছবি: সিএনএন
ভেরোনিকা বসবাস অস্ট্রিয়ার ন্যোৎস ইম গাইলতাল নামের একটি ছোট্ট গ্রামের খামারে। এখানে রয়েছে সবুজ ঘাসে ঘেরা মাঠ, আশপাশে মানুষের আনাগোনা; যা একটি পোষা গরুর জন্য আদর্শ পরিবেশ। গবেষকরা ভেরোনিকার দক্ষতা যাচাই করতে কিছু পরীক্ষা চালান। তার সামনে বিভিন্নভাবে একটি ডেক ব্রাশ রাখা হয়। প্রতিবার সে নিজের লম্বা জিহ্বা দিয়ে ব্রাশটি তুলে নেয়। এ সময় ভেরোনিকা ব্রাশের কোন দিকটি শরীরের কোন অংশে ব্যবহার করছে, তা গবেষকরা নোট করে রাখেন।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভেরোনিকা শুধু ব্রাশ ব্যবহারই করছে না, বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করছে। শরীরের ওপরের মোটা চামড়ার অংশে সে ব্রাশের শক্ত ব্রিসলস দিকটি ব্যবহার করে জোরে ঘষে। আবার শরীরের নরম বা সংবেদনশীল জায়গায় ব্যবহার করে ব্রাশের মসৃণ দিকটি, যাতে চাপ কম লাগে। একই সরঞ্জামের দুই প্রান্ত ভিন্ন কাজে লাগানোর এমন উদাহরণ এতদিন শুধু কঙ্গো অঞ্চলের শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেই দেখা গিয়েছিল।
হাত বা বিপরীতমুখী বৃদ্ধাঙ্গুল না থাকা সত্ত্বেও ভেরোনিকার মুখের নিয়ন্ত্রণ গবেষকদের মুগ্ধ করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সে গ্রিপ বদলায়, শরীরের অংশ অনুযায়ী নড়াচড়ার ধরন পাল্টায়। ওপরের দিকে ঘষার সময় থাকে স্ক্রাবিং মুভমেন্ট, নিচের দিকে থাকে নিয়ন্ত্রিত ঠেলা।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক বেকফ বলেন, ভেরোনিকার আচরণ স্পষ্টভাবেই টুল ব্যবহারের উদাহরণ। তার মতে, অন্য অনেক গরুর মধ্যেও এ সক্ষমতা থাকতে পারে, হয়তো আমরা খেয়াল করিনি।
প্রাণী বুদ্ধি নিয়ে মানুষের ধারণা বদলানোর এ ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৬০ সালে জেন গুডল শিম্পাঞ্জির টুল ব্যবহারের তথ্য দিয়ে মানুষকেন্দ্রিক ধারণা ভেঙেছিলেন। ১৯৭০ এর দশকে আইরিন পেপারবার্গ আফ্রিকান গ্রে তোতার জটিল চিন্তাশক্তির প্রমাণ দেন। ভেরোনিকার ঘটনা সে ধারাবাহিকতারই আরেকটি অধ্যায়।
গবেষকদের ধারণা, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা ও সমৃদ্ধ পরিবেশ ভেরোনিকাকে এ আচরণ শেখার সুযোগ দিয়েছে। তবে ভেরোনিকা যে ‘গরুদের আইনস্টাইন’ বিষয়টি এমন নয়। বরং আরো অনেক গরু ও খামারের প্রাণীর মধ্যে এমন ক্ষমতা থাকতেই পারে, যা হয়তো এতদিন আমাদের নজরের বাইরে রয়ে গেছে।

মানুষের সহচর্যই হয়তো ভেরোনিকাকে এমন অভিনব কৌশল শিখতে সাহায্য করেছে। ছবি: সিএনএন
ভেরোনিকাকে নিয়ে গবেষণা চলবে। একই সঙ্গে প্রাণী গবেষকরা আহ্বান জানিয়েছেন, কেউ যদি খামারের কোনো প্রাণীকে এভাবে কোনো বস্তু ব্যবহার করতে দেখেন, তবে তাদের জানাতে। কারণ আমাদের সঙ্গেই বাস করা এত কাছের প্রাণীগুলো সম্পর্কে আমরা আসলে কত কম জানি, ভেরোনিকা তাই নতুন করে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে।
—সিএনএন থেকে অনূদিত










