বিয়ে মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়, সেইসঙ্গে সামাজিকভাবে এটি একটি শুদ্ধতম রীতি। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে আছে বিভিন্ন প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান, লোকাচার ও বিয়ের গানের মতো মননশীল বিষয়ও। একসময় বিয়ে বাড়ির প্রধান অনুষঙ্গ ছিল বিয়ের গান বা গীত। বিয়ের প্রতিটি ধাপে গাওয়া হয় ভিন্ন ভিন্ন গীত, অঞ্চল ভেদেও আছে গানের ভিন্নতা।

‘ছোট ছোট মারোয়া/ ঢাল ঢাল পান/ শহরে মেলিয়া গেইছে ডাল/ রে মারোয়া ভালোবাসোম তোক...।’

এ গীত কোনো কাগজে লেখা কবিতা নয়। এর নির্দিষ্ট রচয়িতা বা স্বরলিপি নেই । এটি এক জীবন্ত মৌখিক সাহিত্য, যার জন্ম গ্রামীণ অভিজ্ঞতায়, আর বিকাশ সমবেত কণ্ঠে। এতে পুরুষের অংশগ্রহণ ঐতিহ্যগতভাবে কম। গীদালেরা (গীতগাওনি নারী) মুখে মুখে নিজেরাই রচনা করেন গীত, পরিবেশনও করেন পরম্পরায় অর্জিত সুরে। কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখে মুখে এগিয়ে চলে এ সুরসংস্কৃতি।

ChatGPT Image Nov 14, 2025, 12_12_09 PM

প্রতিটি গীতে নারীর পিতৃগৃহত্যাগের বেদনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন জীবনের আশঙ্কা। একদিকে আনন্দের উত্তেজনা, অন্যদিকে বিচ্ছেদের কান্না। গীতের কথা কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়, কখনো ব্যঙ্গ করে, অতি সাধারণ কথায় হৃদয় স্পর্শ করে।

একই গীত বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন রূপ নেয়। সুর অপরিবর্তিত রেখে পাল্টে যায় গানের ভাষা—এটাই মৌখিক ঐতিহ্যের সৌন্দর্য। বিয়ের গীত শুরু হয় ঘটকালি থেকে। দরিদ্র ঘরের আত্মপরিচয়, হাস্যরস আর আত্মমর্যাদার মিশেলে উঠে আসে গানের কথায়—
‘ওরে মরার ব্যাটা ঘটোককোনা/ আলচে হামার বাড়িতে/ কী খাইতে দিমো এলা/ চাউল নাই হামার হাঁড়িতে...’

এ যেন কনের পরিবার ও ঘটকের মধ্যে সুরের ভাষায় দর কষাকষি। গানের আড়ালে ফুটে ওঠে সামাজিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন। গায়েহলুদ, গোসল, মারোয়া সাজানো, ফোড়ল জ্বালানো- বিয়ের প্রতিটি আচারের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে গানের সুর। গায়ে হলুদে গাওয়া হয়,

‘ঝরি পড়ে ছিপোরে ছিপো/ আঙিনা হইল মোর পিছিলা রে রসিয়া/ সেই না আঙিনায় নাচন রে নাচিতে/ ছিঁড়িল গলার মালার রে রসিয়া...।’ এই ছিঁড়ে যাওয়া মালা কেবল অলংকার নয়, যেন নিজের শৈশব, ঘর, নিজের পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

ফোড়ল ডোবানোর আগে গীত চলে, ‘আগে আগে যায়রে মোড়লী/ পাছে যায় তার ফোড়লী/ মধ্যে যায় রে সোনার চাইলন বাতি/ সোনার চাইলন থাকিতে বাঁশের চাইলন ব্যারকাইছে (বের করেছে)/ হয়া যাক আজ এই চাইলনের শাদি...।’

বিয়ের গীতের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশ গায়ে হলুদ। গানের মাধ্যমে বিয়ের আগে কনের পক্ষ থেকে বাবা-মায়ের কাছে শেষবারের মতো আশীর্বাদ ও ভালোবাসা চায় গীদালেরা।

‘কন্যা ডাক দেও তোর জননী না মাইরে
মাও দিয়া যাওক সোনা মুখে হলদিরে।’

কনে সাজাতে গিয়ে গীতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় নতুন বউয়ের সৌন্দর্য আর স্বপ্নকে। তেমনই এক সুপ্রাচীন বিয়ের গীত—
‘গাও তোলো গাও তোল কন্যা হে
কন্যা গায়ে বিয়ের শাড়ি
এই শাড়ি পিন্দিয়া যাইবেন শ্বশুর বাড়ি
কন্যা পেন্দ্য নাকের ফুল
পাতাবাহার চিরুনি দিয়া তুলিয়া বান্দো চুল কন্যা হে।’

অসংখ্য বিয়ের গান আছে যেখানে কন্যাবিদায়ের কথা আছে, সেসময়ে বাবা-মায়ের যন্ত্রণা, কন্যার মনের দুঃসহ কষ্ট তার বর্ণনাস্বরূপ একটি গান—

‘মন বিন্দাইলাম বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে গো মায়-ও নিরলে বসিয়া
আরো কান্দ কান্দে গো মায়ে ঠান্ডাতে বসিয়া ’

দূর গ্রামে, নির্জন সন্ধ্যায় কান পাতলে অনেক এলাকায় এখনো ভেসে আসে চিরন্তন বাঙালিয়ানা, বিচ্ছেদ আর বেদনাময় সেই সুর। —
‘ডালিমের গাছে ডালিম ধরে/ ডালিমের ভারে হাইলা পড়ে...’
অথবা কন্যাবিদায়ের বেদনাময় স্বর—
‘বাহির কর বাহির কর রে/ অঞ্চলে ঘিরিয়া/ দয়ার বাবা দেখিলে রে না দিবে ছাড়িয়া...’