হলিউড অভিনেতা ম্যাট ডেমনকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনার জীবন অন্যদের তুলনায় আলাদা কেন?’ তিনি হয়তো হেসে বলবেন, ‘হারিয়ে যাওয়া এবং কোটি কোটি ডলার খরচ করে উদ্ধার হওয়া!’
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিম বা কৌতুক বেশ ভাইরাল হয়েছে—হলিউড যেন ম্যাট ডেমনকে মহাবিশ্বের নানা প্রান্তে হারিয়ে ফেলতে এবং তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের কাল্পনিক মিশন তৈরি করতেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। মজার ব্যাপার হলো, এই ট্রল বা মিমটি স্বয়ং ম্যাট ডেমনের চোখেও পড়েছে। আর তা নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া ছিল ঠিক তারই মতো সাবলীল ও রসাত্মক।
‘দ্য ওডিসি’র প্রচারণায় মিম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান, ইন্টারস্টেলার, দ্য মার্শিয়ান এবং দ্য ওডিসি ... আপনারা আমাকে যতবার খুশি হারিয়ে ফেলতে পারেন, কারণ এই চারটি সিনেমায় অভিনয় করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’
তার এই মন্তব্যটি শুধু একটি মিমের জবাব নয়, বরং এটি হলিউডে তার চার দশকের গৌরবময় ক্যারিয়ার এবং সিনেমাগুলোর অবিশ্বাস্য সাফল্যের দিকেই ইঙ্গিত করে।
মিমের পেছনের গল্প: ম্যাট ডেমনকে বাঁচাতে কত খরচ
কৌতুকটি কিন্তু একদম আকাশকুসুম নয়। যদি হিসাব করা যায়, সিনেমাগুলোয় ম্যাট ডেমনকে উদ্ধার করতে অন-স্ক্রিন যে পরিমাণ অর্থ খরচ দেখানো হয়েছে, তা দিয়ে একটি আস্ত দেশের বাজেট তৈরি হয়ে যাবে! এক নজরে দেখে নেওয়া যাক সেই কাল্পনিক কিন্তু আকাশচুম্বী খরচের খতিয়ান—
সেভিং প্রাইভেট রায়ান (১৯৯৮): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন সেনাবাহিনী একজন সাধারণ সৈন্য প্রাইভেট জেমস ফ্রান্সিস রায়ানকে অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে আনার জন্য একটি পুরো স্কোয়াডকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। কারণ যুদ্ধে প্রাইভেট রায়ানের বাকি তিন ভাই মারা যাওয়া, তাকে ফিরিয়ে নিতে এত তৎপরতা।
ইন্টারস্টেলার (২০১৪): বরফে ঢাকা এক দূরবর্তী গ্রহে ড. মান (ম্যাট ডেমন) আটকা পড়েন। তাকে উদ্ধার করতে এবং মানবজাতির নতুন ঠিকানা খুঁজতে পাড়ি দিতে হয় ওয়ার্মহোল।
দ্য মার্শিয়ান (২০১৫): মঙ্গল গ্রহে একা পরিত্যক্ত হয় মহাকাশচারী মার্ক ওয়াটনি। তাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার জন্য নাসা এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থাগুলো যে মিশন চালায়, তার খরচ ছিল কল্পনাতীত।
টুইটার এবং রেডিটের রসিকদের হিসাব মতে, সিনেমাগুলোয় ম্যাট ডেমনকে মহাবিশ্বের বিভিন্ন কোণ থেকে উদ্ধার করতে অন-স্ক্রিন মোট খরচের পরিমাণ প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি! অর্থাৎ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে বাকি ১০০ বিলিয়ন ডলার। এখনকার বাজারদরে ‘দ্য ওডিসি’র অভিযান হিসাব করলে তা হয়েও যেতে পারে। আর এই বিপুল পরিমাণ কাল্পনিক অর্থের অপচয় নিয়েই নেটিজেনরা বছরের পর বছর ধরে মিম বানিয়ে আনন্দ পাচ্ছেন।

ম্যাট ডেমন। ছবি: পিপল
কেন মিমটি এত জনপ্রিয়?
এই মিমের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে হলিউডের একটি নির্দিষ্ট ঘরানার গল্প বলার প্যাটার্ন। মার্কিন সিনেমায় ‘হিরো’ বা ‘আমেরিকান সিটিজেন’কে যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করার একটি চিরন্তন আবেগ কাজ করে। তবে অনেক সময় ঘটনাগুলো এমনভাবে দেখানো হয়— যেন পুরো মানব জাতিকে উদ্ধার করা হচ্ছে। আর ম্যাট ডেমনের চেহারা ও অভিনয়ের মধ্যে এমন একটি সাধারণ মানুষের ভাব রয়েছে, যার কারণে দর্শকরা পর্দায় তার বিপদে সহজেই সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেন। তিনি যখন মঙ্গলের বুকে আলু চাষ করে বেঁচে থাকার লড়াই করেন, কিংবা যুদ্ধের ময়দানে দিশেহারা হয়ে বসে থাকেন, তখন দর্শক তাকে উদ্ধার করার জন্য মনে মনে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। হলিউডের পরিচালকরা ডেমনের এই সহজাত গুণেরই চমৎকার ব্যবহার করেছেন বারবার।
ডেমনের প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ট্রল বা মিমকে অনেক তারকা সহজভাবে নিতে পারেন না। অনেকেই একে উপহাস মনে করে ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু ম্যাট ডেমন এখানে দেখিয়েছেন তার চিরচেনা রসবোধ ও পেশাদারত্ব। মিমটিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে তিনি বরং এর পেছনের সিনেমাগুলোর শৈল্পিক ও বাণিজ্যিক সাফল্যকে উদযাপন করেছেন।
তার উল্লেখ করা সিনেমাগুলো শুধু বড় বাজেটের ব্যবসাই করেনি, বরং চলচ্চিত্র ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’ সর্বকালের সেরা যুদ্ধভিত্তিক সিনেমাগুলোর একটি। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’ বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর দুনিয়ায় একটি মাস্টারপিস। আর রিডলি স্কটের ‘দ্য মার্শিয়ান’ ডেমনের ক্যারিয়ারে এনে দিয়েছিল সেরা অভিনেতা বিভাগে অস্কারের মনোনয়ন।
তাই ডেমন যখন বলেন, ‘আপনারা আমাকে যত খুশি হারিয়ে ফেলতে পারেন’, তখন তিনি মূলত বোঝাতে চান—যদি সিনেমার গল্প এবং নির্মাণ এই মানের হয়, তবে পর্দায় বারবার হারিয়ে যেতে এবং কোটি কোটি ডলারের মিশনে উদ্ধার হতে তার কোনো আপত্তি নেই।
বাস্তব জীবনের ‘উদ্ধারকর্তা’ ম্যাট ডেমন
পর্দায় বারবার উদ্ধার হওয়ার পাত্র হলেও, বাস্তব জীবনে ম্যাট ডেমন কিন্তু একদম উল্টো। তিনি হলিউডের অন্যতম সফল চিত্রনাট্যকার (গুড উইল হান্টিং সিনেমার জন্য অস্কারজয়ী), সফল প্রযোজক এবং একজন সমাজসেবী। বিশ্বজুড়ে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে তার প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়াটার ডট অর্গ’ সংস্থাটি লাখ লাখ মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। অর্থাৎ, পর্দায় যাকে বাঁচাতে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়, বাস্তবে তিনি নিজেই বহু মানুষের জীবন বাঁচানোর কাণ্ডারি।
ম্যাট ডেমনের এই ভাইরাল মিম এবং তার চমৎকার জবাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় কেন তিনি হলিউডের এত প্রিয় এবং দীর্ঘস্থায়ী একজন অভিনেতা। তিনি নিজেকে নিয়ে হাসতে পারেন, দর্শকদের আবেগকে সম্মান করতে পারেন এবং একই সঙ্গে নিজের কাজের মান নিয়ে গর্ব করতে পারেন।
ভবিষ্যতে হয়তো হলিউড তাকে অন্য কোনো গ্যালাক্সি বা অন্য কোনো দুর্গম দ্বীপে আবার হারিয়ে ফেলবে। দর্শকরা আবারও পপকর্ন হাতে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বসবেন এবং স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলবেন— ‘ধুর! ম্যাট ডেমন আবার হারিয়ে গেছে! চলো, একে এবারও উদ্ধার করে আনা যাক।’ আর দিনশেষে এটাই তো সিনেমার আসল জাদু!










