কলিকট নগরীর গঠন
কলিকট শহরটি ‘চতুষ্কোণ রচনা’র ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছিল। এটি নির্মাণে প্রাচীন ভারতীয় ‘বাস্তু শাস্ত্র’র নীতিমালা অনুসরণ করেছিলেন জামোরিন ও তার নগরপরিকল্পনাকারীরা। প্রাথমিক শহরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বড় বাজার বা ‘পালায়ম’ এবং তার চারপাশের এলাকা। পরিকল্পনাটি প্রাচীন চোল রাজধানী কাভেরীপুম্পট্টিনমের মতো ছিল।
শহরটির ক্ষেত্রে ‘যমজকেন্দ্রিক নীতি’ও অনুসরণ করা হয়েছিল। এতে করে বিদেশীদের শহরের মূল অংশ থেকে কিছুটা দূরে রাখা যায়। তাদের বসতি মূল দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে গড়ে তোলা হয়। সেই অংশে আরব, ইহুদি, তুর্কি ও চীনা বণিকরা বসবাস করতেন। মূলত এ শহর গড়ে উঠেছিল বাণিজ্য ও বণিকদের কেন্দ্র করে।
শহরটি নির্মাণের সময়কাল নির্দিষ্ট করা যায় না। ইতিহাসবিদদের ধারণা, ত্রয়োদশ থেকে চতুর্দশ শতকের মধ্যে এই শহর নির্মিত হয়। এই সময়কালে জামোরিনের সম্পদ বাড়তে থাকে এবং তার সেনাবাহিনী দক্ষিণ ও পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ভাল্লুভনাড়, নেডুংগনাড়, ত্রিচূর এবং এমনকি পলঘাটের কিছু অংশ দখল করে। এই সময়ে জামোরিন বর্তমান কেরালার কলিকট থেকে কোচিন পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল অঞ্চলের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান বন্দর ছিল মুজিরিস। কলিকট থেকে এটি প্রায় ১৪০ কিমি দক্ষিণে। বন্দরটি ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে পেরিয়ার নদীর মোহনায় পলি জমে যাওয়ার ফলে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ে। বণিকেরা নতুন সুযোগ ও সুবিধার খোঁজে জামোরিনের অধীনস্থ অঞ্চলে চলে আসেন। এর পেছনে বাণিজ্যিক কারণই প্রধান। মুক্ত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন জামোরিন। ফলে, ব্যবসায়িরা কলিকটের বর্ধিষ্ণু বন্দরে ভিড় করতে থাকেন এবং অচিরেই এটি ভারতের পশ্চিম উপকূলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হয়ে ওঠে।
কলিকট কেবল একটি প্রধান বন্দর হিসেবেই নয়, বরং পূর্ব এশিয়া থেকে আগত পণ্য ও অন্য মসলা যেমন লবঙ্গ, দারুচিনি ইত্যাদির জন্য একটি ‘ট্রান্স-শিপমেন্ট পয়েন্ট’-এ পরিণত হয়। আরব বণিকেরা মূলত ইউরোপীয় বাজারের জন্য পণ্য সরবরাহ করতেন। এ সময় তারা শুধু কলিকটেই এসে মালাবার থেকে মরিচ ও আদা, তামিলাকাম অঞ্চল থেকে পুঁতি, গয়না, তুলা ও লিনেন, পূর্ব এশিয়া থেকে দারুচিনি ও লবঙ্গ এবং চীন থেকে রেশম ও চীনামাটির পাত্র সংগ্রহ করতেন। এরপর তা বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিতেন।
পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যও সমানভাবে প্রসারিত হয়। চীনের বিশাল বাজারগুলো কলিকট থেকে সেবা পেত এবং বর্তমান কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেড়ে যায়। এর প্রমাণ পাওয়া যায় আরব লেখকদের বিবরণ এবং চীনা নথিপত্রে।
কলিকটে নিয়মিত বড় বড় চীনা জাহাজের আগমণ হতো। এগুলোকে ‘ধনরত্ন ভর্তি জাহাজ’ বলা হতো। মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা এসব নিজ চোখে দেখেছেন। তিনি ১৩৪১ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশে কলিকটে অবস্থান করেছিলেন। তৎকালীন চীনের মিং সাম্রাজ্যের সঙ্গে কলিকটের আনুষ্ঠানিক দূত বিনিময়ও হয়েছিল।
একটি প্রশ্ন জাগতে পারে—জামোরিনকে সমুদ্রের রাজা কেন বলা হয়? তার শাসন অঞ্চল উপকূল ও সমুদ্র বাণিজ্যের উপর অধিকার থাকায়ই কি এই নাম? মূলত জামোরিন তিরুনাভায়ার মামাঙ্কম মেলার কর্তৃত্ব গ্রহণ করে নিজেকে ওই অঞ্চলের প্রধান অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তাকে বলা হতো ‘স্বামী থিরুমালপাড়’, যা সংক্ষেপে ‘সামূথিরিপাড়’ বা ‘সামুতিরি’ নামে পরিচিতি পায়। এই শব্দটিই পরে ইংরেজদের উচ্চারণে ‘জামোরিন’ হয়ে যায়।
হাওয়া বদলের সূচনা
কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নয়। এক সময় জামোরিনদের ওপরও এসেছিল আঘাত।
জামোরিনরা সাধারণত সংযত জীবনযাপন করতেন। তারা একটি সুসংগঠিত মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার প্রথা মেনে চলতেন। জামোরিন পরিবার বা কোভিলাকম (যা এক ধরনের রাজপ্রাসাদের মতো বৃহৎ পরিবারিক আবাস)–এর সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য আগের জামোরিনের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হতেন। তার অধীনে ‘এরালপাড়’ (দ্বিতীয় উত্তরসূরি), ‘মুনালপাড়’ (তৃতীয় উত্তরসূরি) ইত্যাদি পদমর্যাদাগুলো নির্দিষ্ট শৃঙ্খলার ভিত্তিতে নির্ধারিত ছিল এবং এই উত্তরাধিকার প্রথায় কখনো কোনো প্রতারণা বা ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায় না।
কলিকটের জামোরিনদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কোচিনের রাজারা। জামোরিনদের পূর্বপুরুষদের তাদের নিজভূমি থেকে উৎখাত করে এই কোচিন রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারা কোচিন নামের নতুন এক স্থানে বসতি গড়ে তোলে। সেখানে একটি প্রাকৃতিক বড় বন্দর ছিল। এই নতুন বন্দরও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং মসলা বাণিজ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোচিন শহরের প্রভাব-প্রতিপত্তিও বাড়তে থাকে। একই সময়ে যখন কলিকটও সমৃদ্ধি অর্জন করছিল। ফলে বিরোধ ছিল অবধারিত।
কোচিনের রাজার সঙ্গে জামোরিনের বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী ছিল এবং এই সংঘাত বারবার যুদ্ধের রূপ নিত, যা অঞ্চলটির শান্তি বারবার বিনষ্ট করত।
কলিকট ও কোচিনের রাজপরিবারের এই স্থায়ী শত্রুতা কেবল তাদের নিজ নিজ কোষাগারই নিঃশেষ করত না, বরং দূর-দেশের শক্তিগুলোর নজর ধীরে ধীরে তাদের সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিকে পড়তে শুরু করেছে। বিষয়টি দুই রাজার কেউই বুঝতে পারেননি। পঞ্চদশ শতকের মধ্যে ভেনিসের বাজারে মুনাফা দ্রুত কমতে শুরু করে এবং ইউরোপীয় বণিকেরা মধ্যস্থতাকারীদের বাদ দেয়ার কথা ভাবতে থাকে। এই ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী ছিলেন আরব বণিকেরা। মিশরের মামলুক সুলতানরা তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করত।
আরবদের ওপর ইউরোপীয়দের বিরাগ ছিল নানা কারণে। প্রথমত তারা দ্রব্যের উচ্চ মূল্য রাখত। ধর্মীয় দ্বন্দ্বের কারণেও তারা বিরূপ ছিল কেননা সে সময় ইউরোপে খ্রিস্টানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে লিপ্ত ছিল।
আরবরা তখন সমুদ্র ও সমুদ্রপথ এবং বহু বাণিজ্যবন্দর নিয়ন্ত্রণ করত এবং ভেনিসের বণিকদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অংশীদারিত্বে ছিল। ঐতিহাসিকভাবে, কলিকট থেকে রপ্তানিকৃত পণ্য আরব সাগর পেরিয়ে ধৌ (বিশেষ ধরনের পালতোলা নৌকা) দ্বারা পৌঁছে যেত লাল সাগর ও পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোতে। সেখান থেকে উটের কাফেলার মাধ্যমে এই পণ্য মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে নিয়ে যাওয়া হতো। তারপর সেগুলো ভেনিসে পাঠিয়ে ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হতো।
এদিকে, কলিকটে আরবরা চীনাদের সঙ্গে সহাবস্থান করার বিষয়টি কঠিন মনে করতে শুরু করে। পঞ্চদশ শতকের শুরুতে মিং রাজবংশের অধীনে চীনা নৌবাহিনীর বিখ্যাত নৌ-অনুসন্ধানকারী অ্যাডমিরাল ঝেং হে সাতটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এসব অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামুদ্রিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব বিস্তার করা।
ঝেং হে ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে কলিকটে মারা যান। তিনি আরব অঞ্চল পর্যন্ত যাত্রা করেছিলেন। অনেকের মতে, তিনি এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের আরব আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। এটি আরবদের জন্য একটি সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
কলিকটে আরবদের পক্ষে চীনা সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহাবস্থান কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এটি ঠিক কেন ঘটেছিল তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়—ঝেং হের আরব ভূখণ্ডে প্রত্যক্ষ অভিযানের একটি কারণ। এছাড়াও ইতিহাসবিদরা মনে করেন (প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে সফররত জোসেফ দ্য ইন্ডিয়ান-এর বিবরণ অনুযায়ী) পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে কলিকটে থাকা চীনা বণিক ও জনবসতিকে আরবদের দ্বারা সহিংসভাবে উৎখাত করা হয়। এই চীনারা এরপর পূর্ব ভারতের তামিল উপকূলের দিকে চলে যান।
ভাস্কো দা গামার কালিকটে আগমন
পর্তুগালের রাজা ভাস্কো দা গামাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি কালিকটে গিয়ে স্থানীয় রাজার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের কেনিয়ার মালিনদিতে আটকে পড়ে, কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে আসার পর, দা গামা দিশেহারা হয়ে পড়েন। ঠিক তখনই তিনি গুজরাতি নাবিক মালেমো কানার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি ভাস্কোকে কালিকটে পৌঁছে দিতে রাজি হন। এভাবেই ১৪৯৮ সালের মে মাসে ভাস্কো দা গামা কাপ্পাড বা পান্তালয়ানিতে (বর্তমান কেরালার কালিকটের কাছে) পৌঁছান। তখনই ইউরোপের কাছে সরাসরি কালিকট পর্যন্ত সমুদ্রপথ উন্মোচিত হয়।

কালিকটে নামছেন ভাস্কো দা গামা । ছবি: পিপস অব হিস্টোরি
দা গামা এরপর জামোরিনের সঙ্গে দেখা করেন এবং বুঝতে পারেন যে, তিনি কিছু সস্তা উপহার বা চকচকে বস্তু দিয়ে প্রভাবিত হবেন না। যদিও তিনি মশলার একচেটিয়া বাণিজ্য চুক্তি করতে ব্যর্থ হন, তবু আরব বণিকদের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কারণ তারা ভবিষ্যতের ঝুঁকি আঁচ করতে পেরেছিলেন।
দা গামা এরপর লিসবনে ফিরে যান এবং পরবর্তী সময়ে, পর্তুগালের রাজা তাকে এবং পেদ্রো আলভারেজ ক্যাব্রালের মতো অন্যান্য অভিযাত্রীদের বারবার প্রেরণ করেন। সাধারণভাবে মনে করা হয় এরা কেবল অভিযাত্রী ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল যেন আরবদের হাত থেকে মশলার বাণিজ্য দখল নেওয়া যায়। কিন্তু এইসব অভিযাত্রার ফলে অপ্রয়োজনীয় সহিংসতা, কালিকটের ওপর বোমাবর্ষণ, ব্রাজিলের আকস্মিক আবিষ্কার এবং জামোরিনদের সঙ্গে পর্তুগিজদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
(তৃতীয় ও শেষ পর্ব রোববার প্রকাশ হবে)










