বিশ্বের অনেক শহরে যখন ২৫ ডিসেম্বরে বড়দিনের উৎসব শেষ হয়ে আসে, তখন আরেকটি বড়দিনের প্রস্তুতি শুরু হয় ভিন্ন ছন্দে, ভিন্ন আবহে। ক্যালেন্ডারের পাতায় যখন ৭ জানুয়ারি, তখন রাশিয়া, গ্রিস, ইথিওপিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে অর্থোডক্স খ্রিস্টানরা উদযাপন করেন যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন। তাদের এ বড়দিনের সময় নির্ধারিত হয় প্রাচীন জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, যা আধুনিক ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছিয়ে।
আলাদা এ তারিখের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য। আধুনিক বিশ্ব এখন ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’ অনুসরণ করলেও অর্থোডক্স গির্জাগুলো আজও আঁকড়ে ধরে রেখেছে প্রাচীন ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’কে। আর এ প্রাচীন ক্যালেন্ডারটি আধুনিক ক্যালেন্ডারের চেয়ে ঠিক ১৩ দিন পিছিয়ে। এ জন্যই পশ্চিমা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিল না থাকায় অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের বড়দিন পড়ে ৭ জানুয়ারিতে। রাশিয়া, ইউক্রেন, সার্বিয়া, জর্জিয়া ও মিসরের মতো দেশে দিনটি আসে গভীর ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে। উৎসবের চেয়ে এখানে বেশি গুরুত্ব পায় প্রার্থনা, আত্মসংযম আর নীরবতা।
বড়দিনের আগে তারা পালন করেন দীর্ঘ ৪০ দিনের উপবাস। এ সময়টায় মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা হয়। বিশ্বাসীরা মনে করেন, এ উপবাস তাদের আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং উৎসবের জন্য তাদের শরীর ও মনকে প্রস্তুত করে। বড়দিনের আগের রাতে গির্জাগুলো ভরে ওঠে মোমবাতির আলোয়। গভীর রাতে শুরু হয় দীর্ঘ প্রার্থনা, যেখানে গান, পাঠ আর নীরবতার মধ্য দিয়ে যিশুর জন্ম স্মরণ করা হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহতে অর্থোডক্স বড়দিনের প্রাক্কালে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করছে এক শিশু
উৎসবের দিনে পরিবারগুলো একত্র হয়। অনেক দেশে শিষ্যদের স্মরণে পরিবেশন করা হয় ১২ পদের নিরামিষ খাবার। রাশিয়ায় ‘কুত্য’ নামের মিষ্টি শস্যের খাবার আর ইথিওপিয়ায় সাদা পোশাকে পালিত ‘গ্যানা’ উৎসব এই দিনের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। এ সময় খাবার, পোশাক আর আচরণে স্পষ্ট থাকে সংযমের ছাপ।
অর্থোডক্স বড়দিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য জাঁকজমকের অনুপস্থিতি। এখানে নেই বাণিজ্যিক আলোঝলমল আয়োজন। আছে শান্ত প্রার্থনা, পারিবারিক বন্ধন আর বিশ্বাসের গভীরতা। এই বড়দিন তাই শুধু উৎসব নয়, আত্মশুদ্ধি আর মানবিকতার বার্তা নিয়ে আসা এক নীরব উদযাপন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।











