রাত ২টা, সমুদ্র সৈকতে উড়ে বেড়াচ্ছে এক জোড়া ঈগল। চারদিকে নীরবতা, কিন্তু আকাশ এখনো আলোয় ভরা। সূর্য ডুবছে না, একপ্রান্তে হেলে সোনালি আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে নীল নোনা পানিতে। ঘড়ির কাঁটা যতই রাতের দিকে গড়াক, আলোর সেই উজ্জ্বলতা কমে না, অন্ধকারও নামে না। কিন্তু সময় কি আদতে থেমে আছে? নরওয়ের উত্তর উপকূলে, আর্কটিক উপবৃত্তের গভীরে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে গ্রীষ্মের রাতে সূর্য একবারো অস্ত যায় না।
প্রাকৃতিক এই বিস্ময়ের নাম ‘মিডনাইট সান’ বা মধ্যরাতের সূর্য। পৃথিবীর অক্ষ একটু কাত হওয়ায় গ্রীষ্মে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে হেলে থাকে। ফলে নরওয়ের ট্রোমসো, লোফোটেন দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর কেপ বা ফ্লাটোই ফাইরের মতো এলাকায় দিনের আলো চলে আসে রাতেও। অর্থাৎ ঘড়ির কাটায় রাতের সময় দেখালেও সূর্যের আলো ঠিকই থাকে।
এই দৃশ্য দেখতেই লেখক অ্যালান জেনকিনস ও আলোকচিত্রী হাওয়ার্ড সুলি কিছুদিন কাটিয়েছেন নির্জন দ্বীপ ফ্লাটোই ফাইরে। বাতিঘরের কাঠের কেবিনে তারা থাকতেন। রাতে ঘুম না এলেও জানালায় দেখা মিলত বিশাল সি ঈগলের, আকাশে ঘুরে বেড়াত আরো অনেক পাখি। সূর্যের আলো থাকায় এখানে রাত ২টায়ও পাখিরা গান গায়।
লেখক মূলত ভোর নিয়ে একটি বই লেখার জন্য এই যাত্রায় বের হয়েছিলেন। কিন্তু যেখানে রাতই নেই, সেখানে ভোর আসে কীভাবে? এই দ্বীপে সূর্যই তো নামে না। তাই সময়কে নতুনভাবে চিনতে বাধ্য হন তারা। এখানে দিনের আলো শুধু সূর্য নয়। বরং সময়, ঘুম আর জাগরণের সংজ্ঞাও বদলে দেয়।
ফ্লাটোইয়ের প্রকৃতির সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে যান তারা। মাছ ধরেন, রান্না করেন, সারা রাত বারান্দায় বসে আলো গোনেন। তবে শুধু প্রকৃতির নির্জনে থেমে থাকেননি তারা। পরে চলে যান গ্রোটয়া দ্বীপে ভিলা হাউজেন নামের এক বিলাসবহুল হোটেলে। এটি এক সময় ছিল নরওয়ের সবচেয়ে ধনী নারীর বাড়ি, যার সম্পদের উৎস ছিল স্ক্রেই নামের সামুদ্রিক কড মাছ। এখানেও দিন কাটে মাছ ধরা, রান্না আর সূর্য দেখার অপেক্ষায়।
প্রতিদিন সূর্য যেন একটু নিচে গিয়ে আবার উঠে আসে। রাতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। বারবিকিউয়ের পাশে বসে লেখক বুঝতে পারেন, এই নীরব সূর্যের দেশ তাকে এক দর্শনের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ভোর কি কেবল সময়? নাকি এক অনুভূতি? রাত না থাকলে, ঘুমের প্রয়োজন ঠিক কিভাবে তৈরি হয়?
দিন শেষে লেখকের মনে হয়, এই সূর্যের দেশে সময় থেমে থাকে না। কিন্তু জীবন যেন থেমে দাঁড়ায়। আলোর এই দেশে ভোর কেবল একটি সময় নয়, বরং এক অনুভূতি। আর সেই অনুভূতি তাকে এনে দেয় এক ধীর, স্থির ও নীরব শান্তি। রাত না থাকলে ঘুম আসে না, আর ঘুম না এলে মানুষ ভাবতে বাধ্য হয়, এই আলোয় ভরা পৃথিবীতে আমরা আসলে কী খুঁজছি?
—দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে










