তুষারে ঢাকা মাঠ, হিমশীতল বাতাস আর উত্তেজিত দর্শকের চিৎকার... ফিনল্যান্ডের উত্তরের ছোট শহর সাল্লায় আবারো বসেছিল ঐতিহ্যবাহী রেইনডিয়ার দৌড়ের আসর। কয়েক দশক ধরে চলে আসা এ প্রতিযোগিতা এখনো আগের মতোই মানুষকে আকৃষ্ট করে। চলতি সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠিত সাল্লা রেইনডিয়ার কাপ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে জড়ো হন দর্শকরা। এখানে দেখা যায়, তুষারের ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলে রেইনডিয়ার আর তাদের পেছনে স্কি করতে থাকেন চালকরা।
সাল্লা শহরটি ওউলু নগরী থেকে প্রায় ২৬৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। এর তাপমাত্রা এবার ছিল হিমাঙ্কেরও নিচে। তীব্র শীতল আবহাওয়া ও দুর্গম অবস্থান সত্ত্বেও প্রায় এক হাজার মানুষ সেখানে হাজির হয়েছিলেন প্রতিযোগিতা দেখতে। অনেকেই এসেছিলেন দূরদেশ থেকে। ইতালি, নরওয়ে, জার্মানি ও ফ্রান্স থেকেও দর্শক ছিলেন সেখানে।
দৌড় শুরু হতেই তুষারে ঢাকা ট্র্যাকে ছুটে চলে রেইনডিয়ারগুলো। তাদের পেছনে স্কি পরে দাঁড়িয়ে থাকেন চালক। রেইনডিয়ার যত দ্রুত ছুটবে, তত দ্রুত স্কির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকেও টেনে নিয়ে যাবে সামনে। নিয়ম খুবই সহজ, যে সবচেয়ে দ্রুত শেষ করতে পারবে, সেই জয়ী।

প্রতিযোগিতার শুরুতে গেট খোলার পরপরই স্কি সহ পূর্ণ শক্তিতে ছুটে চলছে এক খুদে রেইনডিয়ার। ছবি: এপি
উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলে রেইনডিয়ার পালন বহু পুরোনো ঐতিহ্য। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের উত্তরের সামি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে এটি গভীরভাবে জড়িত। তাদের সংস্কৃতি, জীবনধারা ও অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে আছে এ প্রাণীগুলো।
সাল্লা রেইনডিয়ার কাপের প্রধান লাসে আৎসিনকি বলেন, এ শহরে রেইনডিয়ার দৌড়ের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৫০ এর দশক থেকেই এ প্রতিযোগিতা হচ্ছে। তখন শীতকালে অনেক পুরুষ বনাঞ্চলে কাজ করতেন। তাঁদের এমন কোনো তুষারযানও ছিল না। শীতের শেষে রেইনডিয়ারগুলো শক্তিশালী ও সুস্থ থাকত। সেখান থেকেই তাদের নিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতার ধারণা জন্ম নেয়।
এখন অবশ্য এ দৌড় একটি নিয়মতান্ত্রিক ও সংগঠিত খেলায় পরিণত হয়েছে। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পুরুষ রেইনডিয়ারগুলোই এতে অংশ নেয়।
প্রতিযোগিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো ‘হট সিরিজ’। এখানে অংশ নিতে হলে এক কিলোমিটার দীর্ঘ ট্র্যাক ১ মিনিট ১৯ সেকেন্ড বা তার কম সময়ে শেষ করতে হয়। কেবল দ্রুততম রেইনডিয়ারগুলোই এ পর্যায়ে সুযোগ পায়।
আৎসিনকি বলেন, বিষয়টি অনেকটাই বিজ্ঞানের মতো। একটি রেইনডিয়ারের স্বভাব এখানে বড় ভূমিকা রাখে। দর্শকের শব্দ, অন্য রেইনডিয়ারের উপস্থিতি বা চারপাশের নড়াচড়াসহ সবকিছু সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হয়। প্রতিটি মালিকের আবার নিজস্ব কিছু কৌশল থাকে, যা সাধারণত গোপনই রাখা হয়।
প্রতিযোগিতা চলাকালীন দর্শকরা ‘হিব্বা’ ও ‘মেনে’ বলে চিৎকার করে প্রিয় হরিণদের উৎসাহ দেন, ফিনিশ ভাষায় যার অর্থ ‘ভালো’ ও ‘যাও’। সেই উল্লাসের মধ্যেই শেষ ল্যাপে ঝড়ের গতিতে ছুটে চলে রেইনডিয়ারগুলো। প্রতিযোগিতার ফাঁকে দর্শকরা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী রেইনডিয়ার স্যুপ এবং ‘কামপানিসু’ নামের এক বিশেষ ধরনের পেস্ট্রি খেয়ে নিজেদের শরীর গরম রাখেন।
রোববার চূড়ান্ত পর্ব শেষে বিজয়ী হয় ‘পমপম’ নামের একটি রেইনডিয়ার। এর মালিক হান্নু ক্রুপুলা বলেন, ‘পমপম খুব দ্রুত ও বুদ্ধিমান। এমন রেইনডিয়ার খুব কমই দেখা যায়।’
তিনি হাসতে হাসতে আরো বলেন, ‘পমপম দেখতে খুব আকর্ষণীয় নয়। বাইরে থেকে দেখলে অনেকেই ভাবতে পারেন ওকে হয়তো ঠিকমতো খাওয়ানো হয়না। কিন্তু বাস্তবে ও অনেক খায়।’
প্রতিযোগিতা শেষে পমপমসহ সব রেইনডিয়ারকেই পুরস্কার হিসেবে তাদের প্রিয় খাবার ‘লাইকেন’ বা শৈবাল খেতে দেয়া হয়। গাছ ও পাথরের গায়ে জন্মানো এ উদ্ভিদটি হরিণদের খুব পছন্দের খাবার।
দৌড় শেষ হলে পমপমসহ সব রেইনডিয়ারই পায় তাদের প্রিয় পুরস্কার লাইকেন। গাছ বা পাথরের ওপর জন্মানো রঙিন এই জীবই তাদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার। তুষারের মাঠে দৌড় প্রতিযোগিতা শেষ হলেও রেইনডিয়ারদের খাবারের উৎসব তখনো চলতেই থাকে।
—এপি থেকে তথ্য নিয়ে অনুবাদ করেছেন মাহফুজা মিম










