অক্টোবরের বিকেলগুলো এমনিতেই বিষন্ন। বাতাসে শীতের আবহ। রাস্তার নিয়ন বাতির আলোতে ইদানীং কুয়াশার ছায়া মেলে। এমন বিষন্ন বিকেলে শোকে নিস্তব্ধ হওয়ার মতো একটা সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। চলে গেলেন তিন গোয়েন্দার স্রষ্টা- রকিব হাসান। নব্বইয়ের দশকে যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তাদের কৈশোরে উন্মুক্ত হওয়া কল্পনার দরজাটা যেন চিরতরে শক্ত করে এঁটে দিলো কেউ।

আশি-নব্বইয়ের দশকে ক্লাসের বই ছাড়া অন্য বইকে বলা হতো ‘আউট’ বই। আর আউট বই পড়া ছিল যেন গর্হিত অপরাধ। গ্রামাঞ্চলে পড়ায় পাড়ায় পাঠাগার ছিল। সপ্তাহে এক বা দুইদিন বই দেয়া নেয়া বা বসে পড়ার ব্যবস্থা ছিল। পাঠাগারের শেলফে থরে থরে সাজানো শরৎ, বঙ্কিম, মানিক, বিভূতি বা সমসাময়িক লেখকদের বই। আর ছিল সেবাপ্রকাশনীর পেপারব্যাকের কিশোর অ্যাডভেঞ্চার- তিন গোয়েন্দা।

সাইজে ছোট আকারের সে বইগুলোর লেখক রকিব হাসান। তার হাত ধরেই মুসা, রবিন ও কিশোরের সঙ্গে পাঠকের পরিচয়। ছুটির দিন দুপুরে পড়া সেসব বই পাঠকের সামনে রোমাঞ্চের জগৎ খুলে দিয়েছিল। প্রতিটি বইই ছিল নতুন নতুন অভিযান। রকিব হাসানের বর্ণনায় পাঠক ঘুরে আসে আমেরিকা, আফ্রিকা, অ্যান্টার্কটিকা থেকে। তিনিই ভয়কে জয় করতে শেখান। বিশ্বাস করতে শেখান সব বাধা পেরিয়ে সত্য জয়ী হয় আর বন্ধুত্বই সবচেয়ে বড় শক্তি।

পড়তে পড়তে পাঠক বিশ্বাস করতে শুরু করে লস অ্যাঞ্জেলেসে রকি বীচ নামে সত্যিই একটা সৈকত আছে। সেখানে আছে জগিং সুট পরা পনিটেইল করে চুল বাঁধা জর্জিনা পার্কার। কোনোদিন সেখানে গেলে পাঠকও দেখতে পাব তিনটা সাইকেল নিয়ে তিন কিশোর বিচের পাশে বসে আছে। একজন কালো-মোটাসোটা, একজনের হাতভর্তি বই, আর অন্যজন নিচের ঠোটে চিমটি কেটে কী যেন ভাবছে। শুটকি টেরি, মেরি চাচী; এমনকি ফগর‍্যাম্পারকট, মোবাইলহোম, হেডকোয়ার্টার, টেরর ক্যাসল পাঠকের চোখে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পেপারব্যাকের চায়না নিউজপ্রিন্টের অমূল্য রত্ন নিয়ে নব্বই দশকের কিশোররা খাটের নীচে লুকিয়ে যেত। ঘন ধান ক্ষেতের আইল, পুকুর পাড় কিংবা কোনো গোপন আস্তানায় বসে কিশোর-মুসা-রবিনদের সঙ্গে অসংখ্য বিকেল কাটিয়েছে নাইনটিনজ কিডরা । বুক শেলফ, বইয়ের ব্যাগ, বিছানার নীচে বা বালিশের পাশে থাকত রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা।

রকিব হাসান কেবল তিন গোয়েন্দারই লেখক ছিলেন না। তিনি অনুবাদও করেছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক সাহিত্যের রোমাঞ্চ, রহস্য, ইতিহাস, সায়েন্স ফিকশন। ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলা, অ্যারাবিয়ান নাইটস, জেরাল্ড ডুরেলের কাহিনী—সবই তার হাতের ছোঁয়ায় বাংলাদেশি পাঠকের জন্য হয়ে উঠেছিল পরিচিত। তার লেখা রোমহর্ষক ও গোয়েন্দা রাজু সিরিজও নবীন পাঠকের কল্পনাশক্তিকে উন্মুক্ত করেছে।

রকিব হাসান চলে গেলেন, কিন্তু তার সৃষ্টি পাঠকের সঙ্গে চিরকাল বেঁচে থাকবে। সেবা প্রকাশনী আর তিন গোয়েন্দার মাধ্যমে রকিব হাসান বারবার ফিরে আসবেন অক্ষরে, কল্পনায়, ভালোবাসায়।