মানুষ বয়স ধরে রাখতে কত কিছুই না করে। অথচ কিছু শার্ক যেন জন্মগতভাবেই তাদের বয়সকে হার মানিয়েছে। সমুদ্রের গভীর ও শীতল তলে বাস করা গ্রিনল্যান্ড শার্ক বা হাঙ্গরের আয়ু নিয়ে নতুন এক গবেষণা বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। এক সময় মনে করা হতো এই হাঙ্গরগুলো হয়তো কয়েক দশক বাঁচে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে এদের আয়ু হতে পারে ৪০০ বছরেরও বেশি। অর্থাৎ আজকে সাগরে ঘুরে বেড়ানো কোনো গ্রিনল্যান্ড শার্ক যখন জন্ম নিয়েছিল, তখন হয়তো পৃথিবীতে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসন চলছিল!

শত শত বছর বেঁচে থাকা গ্রিনল্যান্ড শার্ক বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা এড়াতে শরীরের ভেতর বিভিন্ন ধরনের কৌশলী সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে। ছবি: সাইন্স নিউজ
হাঙ্গরের বয়স নিয়ে ধোঁয়াশা
প্রায় এক দশক আগে বিজ্ঞানীরা প্রথম লক্ষ্য করেন, শার্কের বয়স নির্ণয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় রকমের ভুল রয়েছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞানী আলাস্টেয়ার হ্যারির নেতৃত্বে করা একটি বিশ্লেষণে ৫০টির বেশি গবেষণার তথ্য একত্র করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, শার্ক, রে ও অন্যান্য কার্টিলাজযুক্ত মাছের বয়স অনেক কম ধরে হিসাব করা হয়েছে।
গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘ফিশ অ্যান্ড ফিশারিজ’ সাময়িকীতে। এর বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তত ৩০ শতাংশ হাঙ্গর প্রজাতির বয়স বাস্তবের তুলনায় কম ধরা হয়েছিল। গ্রেট হোয়াইট, স্যান্ড টাইগার, ডাস্টি শার্ক সহ আরো বেশ কয়েকটি প্রজাতি আমাদের কল্পনার বহু বছর আগে থেকেই সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

স্যান্ড টাইগার শার্কগুলো আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকে। ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
বয়স নির্ধারণে ভুল কেন?
হাঙ্গরের শরীরে অস্থি নেই। ফলে তাদের কানে থাকা ক্যালসিয়ামের স্তর, যা সাধারণ মাছের বয়স জানতে ব্যবহৃত হয়, সেটিও নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা হাঙ্গরের মেরুদণ্ডে থাকা ক্যালসিফায়েড গ্রোথ ব্যান্ড গুনে বয়স আন্দাজ করেছেন। কিন্তু গবেষণা দেখাচ্ছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যান্ড আর নির্ভরযোগ্য থাকে না।
পারমাণবিক বোমার কারণে বয়স নিয়ে বিভ্রান্তি
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১৯৫০ ও ৬০ এর দশকে সাগরে যে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালানো হয়েছিল, তা এখন হাঙ্গরের বয়স জানতে সাহায্য করছে। বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া সেই তেজস্ক্রিয় কার্বন শার্কদের শরীরে এক ধরনের ‘টাইম স্ট্যাম্প’ বা সময়ের ছাপ রেখে গেছে। হাঙ্গরের দেহ থেকে পাওয়া সেই কার্বন আইসোটোপ পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা এখন নির্ভুলভাবে বয়স নির্ধারণ করতে পারছেন। এ পদ্ধতিতে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অনেক হাঙ্গর আমরা যা ভাবি তার চেয়ে দুই বা তিনগুণ বেশি সময় ধরে সাগরে বিচরণ করছে।
২০০৭ সালে নিউজিল্যান্ড উপকূলে ধরা পোরবিগল হাঙরের ক্ষেত্রে নতুন করে বয়স পরীক্ষা করে পাওয়া গেছে, তাদের বয়স আগের হিসাবের দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। এ পদ্ধতিই গ্রিনল্যান্ড শার্কের বিস্ময়কর দীর্ঘায়ুর প্রমাণ দিয়েছে। গবেষকেরা ধারণা করছেন, এ প্রজাতির কিছু হাঙ্গরের বয়স ৪০০ বছরের কাছাকাছি হতে পারে। তারা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘজীবী মেরুদণ্ডী প্রাণী।
চোখ ও হৃদযন্ত্রের ম্যাজিক
হাঙ্গরের এই দীর্ঘ জীবনের পেছনে কী রহস্য হতে পারে? সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী লিলি ফগ ও তার দল গ্রিনল্যান্ড শার্কের চোখ নিয়ে গবেষণা করেন। প্রায় ১৫০ বছর বয়সী কয়েকটি শার্কের চোখ পরীক্ষা করে দেখা যায়, সেগুলোতে গভীর সমুদ্রের ক্ষীণ আলো দেখার জন্য প্রয়োজনীয় সব কোষীয় ও অণুগত ব্যবস্থা ঠিকঠাক কাজ করছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, চোখের টিস্যুতে বয়সজনিত ক্ষয়ের তেমন কোনো চিহ্ন নেই।

গ্রিনল্যান্ড শার্কের চোখ নিজেদের ডিএনএ মেরামতের জিনগুলোকে সক্রিয় রাখে। এটি তাঁদের শরীরের কোষগুলোকে দীর্ঘকাল সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। ছবি: সাইন্স নিউজ
গবেষকদের ধারণা, চোখে ডিএনএ মেরামতের ক্ষমতা অনেক সক্রিয়। আগের এক জিনোম গবেষণাতেও গ্রিনল্যান্ড শার্কের শরীরে শক্তিশালী ডিএনএ রিপেয়ার ব্যবস্থার ইঙ্গিত মিলেছিল। অর্থাৎ ক্ষতি হলেও শরীর নিজেই তা সারিয়ে নিতে পারে।
তবে সব অঙ্গ যে বয়সকে একইভাবে প্রতিহত করে, এমন নয়। ইতালির পিসা শহরের গবেষক আলেসান্দ্রো চেল্লেরিনোর দল গ্রিনল্যান্ড শার্কের হৃদপিণ্ড পরীক্ষা করে ভিন্ন চিত্র পেয়েছে। সেখানে মানুষের মতোই বয়সজনিত ক্ষত ও দাগ জমতে দেখা গেছে। হৃদকোষের শক্তি উৎপাদনকারী মাইটোকন্ড্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও আশ্চর্যজনকভাবে, এত ক্ষতির পরও এদের হৃদপিণ্ড কাজ চালিয়ে যেতে পারছে।
বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন, কীভাবে এটা সম্ভব হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো এই শার্কদের শরীর এমন কিছু সুরক্ষামূলক হরমোন তৈরি করে, যা হৃদপিণ্ডকে দীর্ঘদিন সচল রাখে।
সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
শার্ক বা হাঙ্গরের আয়ু নিয়ে এই ভুল ধারণা পরিবেশ রক্ষায় বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিজ্ঞানীরা আগে মনে করতেন অনেক মাছ ৩০ বছরেই বুড়িয়ে যায়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে তারা ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত বাঁচে এবং অনেক দেরিতে বংশবৃদ্ধি শুরু করে। ফলে অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের ‘আল্টিমেট গোল’ বা শেষ লক্ষ্য হলো এই হাঙ্গরদের জৈবিক কৌশলগুলো বোঝা। যদি তাদের বার্ধক্য ঠেকানোর রহস্য মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগানো যায়, তবে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে যাওয়ার হাত থেকে মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে মানুষ এখন হাঙ্গর আহরণ করে খাওয়া শুরু করবে। বরং তাদের কোষের টিকে থাকার ক্ষমতা গবেষণাই হতে পারে আগামীর ওষুধের মূল চাবিকাঠি।










