ইউরোপের দক্ষিণ প্রান্ত আর আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের মাঝখানে বয়ে চলা জিব্রাল্টার প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি যেন ইতিহাসের এক বিশাল সংগ্রহশালা। সম্প্রতি স্প্যানিশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা এ সংকীর্ণ জলপথের আলজেসিরাস উপসাগরে অনুসন্ধান চালিয়ে এক অভাবনীয় রহস্যের জট খুলেছেন। মাত্র ২৯ বর্গমাইল এলাকায় তারা ১৫১টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান পেয়েছেন, যার মধ্যে ১২৪টিই হলো প্রাচীন থেকে আধুনিক আমলের ডুবে যাওয়া জাহাজ। সাগরের তলদেশের বিশাল এলাকাটি এখন ইতিহাসবিদদের কাছে এক ‘ডুবন্ত জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

২০২০-২৩ সাল পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, জাহাজগুলো বিভিন্ন সভ্যতা ও সময়ের সাক্ষী। এর মধ্যে ফিনিশীয়, রোমান, মধ্যযুগ এমনকি আধুনিক যুগের জাহাজও রয়েছে।

0dc1b2b1-4373-4950-b44d-6d5bef49df1c

চিহ্নিত ১৫১টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অধিকাংশেই পাওয়া গেছে ডুবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ

গবেষকদের মতে, এ আবিষ্কার প্রমাণ করে, প্রাচীনকাল থেকেই উপসাগরটি আঞ্চলিক ও বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল। আটলান্টিক থেকে ভূমধ্যসাগরে প্রবেশের একমাত্র পথ হওয়ায় যুগ যুগ ধরে নাবিকরা এখানে বিরতি নিতেন কিংবা যুদ্ধের মুখোমুখি হতেন।

আবিষ্কৃত ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন জাহাজটি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর। ক্যাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক ফেলিপে সেরেজো আন্দ্রেও জানান, প্রাচীন এ জাহাজটি সম্ভবত দক্ষিণ স্পেনের ক্যাডিজ শহর থেকে উৎপাদিত মাছের সস নিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাচ্ছিল। এছাড়া ১৯ শতকের শুরুতে নেপোলিয়নের সময়কার বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, যা গবেষকদের কাছে খুব আকর্ষণীয়।

আধুনিক ইতিহাসের চিহ্ন হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইতালীয় নৌবাহিনীর একটি বিশেষ ডুবোজাহাজ বা ‘পিগ’-এর সন্ধান মিলেছে। এটি তৎকালীন ব্রিটিশ নৌবহরে আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

গবেষকরা বলছেন, বর্তমানের হরমুজ প্রণালির মতোই জিব্রাল্টার ছিল সব জাহাজের জন্য বাধ্যতামূলক পথ। আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা অনুকূল বাতাসের অপেক্ষায় জাহাজগুলো এ আলজেসিরাস উপসাগরে নোঙর করে থাকত। আর সেখানেই অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তলিয়ে যেত।

মজার ব্যাপার হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের স্রোত ও পলি সরে যাওয়ায় এই লুকানো ইতিহাস এখন সামনে আসছে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম এমন শব্দতরঙ্গ প্রযুক্তি ও ম্যাগনেটোমিটার ব্যবহার করে মাটির নিচে চাপা পড়া এসব নিদর্শন শনাক্ত করেছেন।

এর আগে, এ এলাকায় মাত্র চারটি নিদর্শনের কথা জানা ছিল। কিন্তু নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে ধীরে ধীরে ইতিহাসের বিশাল ভাণ্ডার উন্মোচিত হচ্ছে।

Capture

এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো পানির মাত্র ১০ মিটার গভীরতায়ই পাওয়া গেছে

গবেষক দলটি বর্তমানে মাত্র ১০ মিটার বা ৩৩ ফুট গভীরতায় অনুসন্ধান চালিয়েছেন। কিন্তু এ উপসাগরের গভীরতা প্রায় ৪০০ মিটার। ফেলিপে আন্দ্রেও বিশ্বাস করেন, সাগরের আরো গভীরে প্রাগৈতিহাসিক আমলের নিদর্শনও পাওয়া যেতে পারে। বর্তমানে চিহ্নিত স্থানগুলোর মাত্র ২৪ শতাংশ বিস্তারিতভাবে গবেষণা করা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো গভীরে গিয়ে প্রতিটি জাহাজের কারিগরি কৌশল ও সে সময়ের নাবিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে আরো বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সিএনএন অবলম্বনে