গত দুই দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক ক্ষেত্রই পরিবর্তিত হয়েছে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল আমাদের যোগাযোগের ধরনই বদলায়নি, বরং ভাষা ব্যবহারের ধরনও পাল্টে দিয়েছে। মিম, হ্যাশট্যাগ, ইমোজি ও ভাষার সংক্ষিপ্ত রূপের ব্যবহার কেবল নতুন শব্দ নয়, ভাব প্রকাশের নতুন পথ সৃষ্টি করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ভাষার গতিকে করেছে দ্রুত। আগে নতুন কোনো শব্দ বা সংক্ষিপ্ত রূপ সাধারণ ভাষায় প্রবেশ করতে বছরের পর বছর লেগে যেত। এখন, একটি নতুন শব্দ বা প্রবণতা দ্রুতই ভাইরাল হয়ে কয়েক দিনে কোটি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লিট, স্যাভেজ বা মুড-এর মতো শব্দগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় জন্ম নিয়ে প্রচলিত শব্দে পরিণত হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দূরকে নিকটে এনেছে, বিভিন্ন দেশের বাসিন্দাদের মধ্যে গড়ে তুলছে বন্ধুত্ব। ফলে এক ভাষার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির নতুন শব্দ, সংক্ষিপ্ত রূপ ও অভিব্যক্তি। উদাহরণস্বরূপ, ফরাসী শব্দ ‘ডেজা ভু’ বা জাপানি ‘সুশি’ ইংরেজিতে জায়গা করে নিয়েছে।

এছাড়া ইমোজি, জিআইএফ, মিমের মতো ভিজুয়াল উপাদানও ভাষায় নতুন স্তর যোগ করেছে। বার্তার অর্থ ও আবহ পরিবর্তন করতে পারে ইমোজি— এর দ্বারা হাসি, ব্যঙ্গ বা উষ্ণতার ভাব প্রকাশ পায়। কিছু ক্ষেত্রে, ভিজুয়াল ভাষা পাঠ্যভিত্তিক ভাষার সম্পূরক বা বিকল্প হয়ে উঠেছে। ভাষাবিদরা বলছেন, এ ধরনের ‘বিকল্প’ ব্যবহারে ভাষার প্রয়োজন সীমিত হয়ে পড়ছে। লেখ্য বা কথ্য ভাষার প্রয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাকরণ ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বাক্যগঠন ও প্রাঞ্জলতার অভাব ভবিষ্যতে শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলতে পারে।

সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার ব্যবহারকারীদের অনানুষ্ঠানিক ও সৃজনশীল ভাষা ব্যবহারে উৎসাহিত করে। ফলে বহুল ব্যবহারে শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ, এক্রোনিম ও স্ল্যাং সর্বস্তরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেশাদার পরিবেশে অনানুষ্ঠানিক ভাষা প্রবেশ করছে। তরুণরা পাঠ্য ও শুদ্ধ উচ্চারণের পরিবর্তে সোশ্যাল মিডিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ ও কথ্যভাষার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। এর ফলে শব্দচয়ন, বাক্যগঠন ও সাহিত্যিক জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ কমছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রফেশনাল ইমেইল বা নিউজ আর্টিকেলে লোল (লাফ আউট লাউড), বিআরবি (বি রাইট ব্যাক), ওএমজি (ও মাই গড) এর মতো শব্দবন্ধের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভাষার এ মিথস্ক্রিয়া আমাদের চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনকেও প্রভাবিত করছে। গত দুই দশকে অক্সফোর্ড ডিকশনারির বর্ষসেরা শব্দগুলোর দিকে তাকালেই এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবছর বর্ষসেরা শব্দ নির্বাচিত হয়েছে ‘রেজ বেইট’। এটি এমন অনলাইন কনটেন্টকে নির্দেশ করে যা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে রাগিয়ে দিয়ে এনগেজমেন্ট বাড়ায়। ফলে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কনটেন্টটি দ্রুত ছড়িয়ে যায়। গত বছর অক্সফোর্ড ডিকশনারির বর্ষসেরা শব্দ ছিল ‘ব্রেন রট’, অনবরত ডিজিটাল কনটেন্ট ঘাঁটার ফলে তৈরি মানসিক ক্লান্তি প্রকাশ করতে এ শব্দ ব্যবহার করা হয়।

গত এক দশকে অক্সফোর্ডের বর্ষসেরা শব্দের তালিকায় জায়গা পেয়েছে ‘রিজ’, ‘সেলফি’, ‘টক্সিক’, ‘ভ্যাক্স’, ‘গবলিন মোড’ এর মতো শব্দ। প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে অনলাইন আচরণ, ডিজিটাল পরিচয় বা ইন্টারনেট প্রভাবিত মানসিক অবস্থার প্রতিফলন।