ষড়ঋতুর দেশ হলেও হেমন্ত এখন আর নিজের বৈশিষ্ট্য মেলে ধরতে পারে না। বরং সে যেন শীতেরই পূর্বরাগ। নগরে তাই হেমন্তের অনেক রূপকে সঙ্গে নিয়ে শীত নামে। হালকা কুয়াশার সঙ্গে ছাতিমের বুনো সৌরভ নিয়ে নামে নভেম্বরের সন্ধ্যা।

সেই সময় আর অনুভবকে ধরে রাখে শুভমিতার গান- ‘তোকে দেখতে দেখতে সন্ধ্যে নামে ছাতিম ফুলের গন্ধে...’

স্বল্পবৃক্ষের নগরীতে ছাতিম প্রাচুর্যেই আছে বলা চলে। তবে দৃষ্টিসীমার চেয়ে বেশি উচ্চতর বলে সহজে নজরে পড়ে না। উচুঁ ভবন, মেট্রোরেল বা এলিভেটর এক্সপ্রেসওয়েতে উঠলে দেখা যায়, পথের পাশে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘিয়ে রঙা ফুল। পরস্পরের সঙ্গে মিলে তোড়া বেঁধে রয়েছে। সারারাত ফুটে থেকে ভোরবেলা নগরীর ফুটপাতে পুষ্পবৃষ্টি ঝরায় তারা।

ছাতিমগাছ অ্যাপোসাইনেসি বর্গের অন্তর্ভুক্ত উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালস্টনিয়া স্কলারিস (Alstonia scholaris)। ভারতীয় উপমহাদেশ এটি পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও ইংরেজিতে একে বলা হয় 'ডেভিল ট্রি'। আর গ্রামাঞ্চলে ডাকা হয় ছাইত্তানিগাছ নামে।

chatim-tree

এর আদিনিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। ক্রান্তীয় অঞ্চলের গাছটি বাংলাদেশের আর্দ্র, কর্দমাক্ত, জলসিক্ত স্থানে বেশি জন্মে। এতে একগুচ্ছ ফুলকে সাতটি পাতা একসঙ্গে ঘিরে রাখে বলে সংস্কৃত ভাষায় একে ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’ নামে ডাকা হয়। গাছের সব পাতা মিলে গড়ে তোলে ছাতার মতো শীতল অবয়ব। ছাতিমের নরম কান্ড দিয়ে ব্লাকবোর্ড, পেন্সিল ও প্যাকিংবক্স তৈরি হয়। এ গাছের ছাল ও আঠা জ্বর, হৃদরোগ, হাঁপানি, ক্ষত, আমাশয় ও কুষ্ঠ রোগ নিরাময়ে সহায়ক।

বাংলার গান-কবিতায় ছাতিম ফুল হয়ে উঠেছে স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, শান্তি ও ভালোবাসার প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় ছাতিম ধরা দেয় মগ্নতায় প্রতীক হিসেবে। তার প্রিয় ফুল ছিল এটি। শান্তিনিকতনে ছাতিম তলায় বসে নিয়মিত লেখালেখি ও পাঠদান করতেন তিনি। সমাবর্তনেও ছাতিম পাতা উপহার দেয়ার চল ছিল সেখানে। রবি ঠাকুর তার কবিতায় ছাতিম ফুলকে ধরে রেখেছেন ঠিক এভাবে,

‘ওই যে ছাতিম গাছের মতোই আছি

সহজ প্রাণের আবেগ নিয়ে মাটির কাছাকাছি,

ওর যেমন এই পাতার কাঁপন, যেমন শ্যামলতা,

তেমনি জাগে ছন্দে আমার আজকে দিনের সামান্য এই কথা।’

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও মুগ্ধ করেছিল ছাতিম ফুলের গন্ধ। পথের পাঁচালীতে আছে তার বিস্তারিত বিবরণ। আরণ্যকে তিনি লিখেছেন,

‘ধনঝরি পাহাড়ে যে এত ছাতিম গাছ আছে তাহা পূর্বে লক্ষ্য করি নাই। এখন প্রথম হেমন্তে ছাতিম গাছে ফুল ধরিয়াছে, তাহারই সুবাস।... ছাতিম ফুলের সুবাস আরও ঘন হইয়া উঠিল, ছায়া গাঢ় হইয়া নামিল শৈলসানুর বনস্থলীতে... ভানুমতী একগুচ্ছ ছাতিম ফুল পাড়িয়া খোপায় গুঁজিল।’