মনোযোগ দিতে পারে না, একটা কাজ শেষ না করতেই অন্যটায় চলে যায়, সময় ম্যানেজ করতে পারে না—এমন অভিযোগ শুধু শিশুদের ক্ষেত্রে নয়। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও প্রতিদিন এ বাস্তবতায় ভোগেন। এ অবস্থার পেছনে থাকতে পারে এক সাধারণ কিন্তু উপেক্ষিত স্নায়বিক অবস্থা—এডিএইচডি বা অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার।

অনেকের ধারণা, এডিএইচডি কেবল শিশুদের সমস্যা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে এডিএইচডিতে আক্রান্ত প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ প্রাপ্তবয়স্ক বয়সেও এর প্রভাব বহন করেন।

understanding-adult-ADHD

এডিএইচডি কী

এডিএইচডি একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার। যা মস্তিষ্কের মনোযোগ, নিয়ন্ত্রণ ও আচরণ ব্যবস্থাপনাকে প্রভাবিত করে। শিশুকালে এডিএইচডি ধরা পড়লে সময়মতো চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু যাদের ক্ষেত্রে নির্ণয় হয় না, তারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এসে নানা জটিলতার মুখে পড়েন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এডিএইচডি-তে আক্রান্ত।

এডিএইচডির লক্ষণ:

  • কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা
  • সহজে ভুলে যাওয়া বা জিনিস হারানো
  • পরিকল্পনা করতে না পারা
  • অস্থিরভাবে নড়াচড়া করা
  • স্থির হয়ে বসে থাকতে কষ্ট হওয়া
  • অতিরিক্ত কথা বলা
  • না ভেবে কাজ করা বা কথা বলে ফেলা
  • অপেক্ষা করতে না পারা
  • হঠাৎ আবেগপ্রবণ আচরণ
32JUDRAM6U6XJIFN6UNQE53UOM

শিশুদের এডিএইচডি

শিশুদের মধ্যে এডিএইচডি দেখা দেয় সাধারণত স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর। তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায়, নির্দেশনা বুঝতে পারে না, নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে না। ফলে শিক্ষকরা অনেক সময় তাদের অমনোযোগী বা দুষ্ট হিসেবে দেখেন, অথচ বাস্তবে তাদের মস্তিষ্ক কাজ করে অন্য ছন্দে। তবে বর্তমানে অভিভাবকরা অনেক সচেতন হয়েছেন। শিশুদের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য লক্ষ্য করে স্কুলে যাওয়ার আগেই সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এডিএইচডি

আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেও পিতা-মাতারা এত সচেতন ছিলেন না। তবে সেসময়ও শিশুদের মধ্যে এডিএইচডি ছিল। সন্তানের স্নায়বিক সমস্যাকে বাবা-মা মনে করতেন অমনোযোগিতা। তাদের অসচতেনতায় তখনকার এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুরা এখন প্রাপ্তবয়স্ক।

তবে প্রাপ্তবয়স্কদের এডিএইচডির রূপ কিছুটা আলাদা হয়। তারা সব সময় চঞ্চল না-ও হতে পারেন, কিন্তু ভেতরে থাকে এক অদ্ভূত অস্থিরতা ও মনোযোগহীনতা।

সাধারণত দেখা যায়—

  • কাজ বা প্রজেক্ট শেষ করতে দেরি হয়
  • সময়মতো দায়িত্ব পালন কঠিন হয়
  • ভুলোমন ও বিশৃঙ্খল চিন্তাভাবনা
  • আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত বা সম্পর্কের টানাপোড়েন
  • সহজেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

ফলে অফিস, পড়াশোনা, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও প্রভাব পড়ে। অনেক সময় উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সঙ্গে মিলেমিশে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়।

adhd3

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, এডিএইচডিতে আক্রান্ত অনেক প্রাপ্তবয়স্কের জীবনে দেরিতে গিয়ে এটি শনাক্ত হয়। তখন চাকরির চাপ, সম্পর্কের ভাঙন বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির মুখে পড়েন তারা।

কারণ ও প্রভাব

এডিএইচডি সাধারণত জিনগত—অর্থাৎ পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও এটি দেখা যেতে পারে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় অপুষ্টি, ধূমপান বা অ্যালকোহল সেবন, অকালে জন্ম, পরিবেশগত বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে আসা এর ঝুঁকি বাড়ায়। মস্তিষ্কের যেসব অংশ মনোযোগ, পরিকল্পনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণে কাজ করে, এডিএইচডি আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সেসব অঞ্চলের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে।

চিকিৎসা ও সহায়তা

এডিএইচডি পুরোপুরি সেরে যায় না, তবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। চিকিৎসা সাধারণত তিন ধরনের হয়—

১. আচরণগত থেরাপি: মনোযোগ বাড়ানো, আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখানো ও সময় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা তৈরি।

২. ওষুধ: মস্তিষ্কের ডোপামিন ভারসাম্য ঠিক রাখে এমন স্টিমুল্যান্ট জাতীয় ওষুধ দেন বিশেষজ্ঞরা।

৩. পরিবেশ ও সামাজিক সহায়তা: পরিবার, স্কুল বা কর্মস্থলের সহমর্মিতা এডিএইচডি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

adhd-in-young-children-20844-a5a7da14c01543ce9b90d1d1d6a64757

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং, রুটিন প্ল্যানার, ডিজিটাল অ্যালার্ম ও মাইন্ডফুলনেস টেকনিক ব্যবহার করা অনেকাংশেই কার্যকর হতে পারে। বাংলাদেশে এ নিয়ে সচেতনতা এখনো সীমিত। স্কুলে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত শিক্ষক বা উপযুক্ত মনোবৈজ্ঞানিক সহায়তা এখনো অপ্রতুল। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে অনেকে দেরিতে এডিএইচডি শনাক্ত হয়।