হেলিকপ্টার বিধস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। সোমবার (২০ মে) তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
এর মধ্যেই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট রাইসির মতাদর্শ ও রাজনৈতিক জীবন।
ইরানের রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিকে দীর্ঘদিন ধরে দেশের সর্বোচ্চ নেতার একজন শিষ্য এবং শিয়া মতাবলম্বী মুসলিমদের অনুশাসনে তার সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হতো। নৈতিকতার প্রশ্ন এবং দেশব্যাপী বিক্ষোভের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়ন অবস্থানের কারণে ইরানের কট্টরপন্থীদের মধ্যে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন।
রাইসি এমন সময়ে প্রেসিডেন্ট হন যখন ইরান একটি সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে দেশের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চাপে কঠিন সময় পার করছে।
কট্টরপন্থী তদারকি সংস্থা তার উল্লেখযোগ্য রক্ষণশীল ও মধ্যপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বীদের অযোগ্য ঘোষণার পর ইব্রাহিম রাইসি ২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন। এ বিজয় ইরানের ক্ষমতার সমস্ত শাখাকে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির অনুগত কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
ইব্রাহিম রাইসির জন্ম ১৯৬০ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি তেহরানের পার্শ্ববর্তী শহর কারাজের প্রসিকিউটর জেনারেল নিযুক্ত হন।
১৯৮৯ থাকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রাইসি তেহরানের প্রসিকিউটর জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সাল থেকে তিনি এক দশক জুডিশিয়াল অথরিটির উপপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৯ সালে তাকে বিচার বিভাগের প্রধান নিযুক্ত করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি।
৬৩ বছর বয়সী ইব্রাহিম রাইসি ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য ছয়টি প্রধান শক্তির সঙ্গে স্থগিত আলোচনায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইরানের ক্রমবর্ধমান উন্নত পারমাণবিক কর্মসূচিতে শুধুমাত্র ন্যূনতম নিষেধাজ্ঞার বিনিময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে উল্লেখযোগ্য ত্রাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েছিলেন। প্রতিবেশী আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ওয়াশিংটনের সুইং পলিসির কারণে ইরানের কট্টরপন্থীদের কাছ থেকে বরাবরই উৎসাহ পেয়ে এসেছেন ইব্রাহিম রাইসি।
২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ছয় বড় শক্তির সঙ্গে তেহরান যে পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল তা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইরানের ওপর কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে। জবাবে তেহরান ধীরে ধীরে চুক্তির পারমাণবিক বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করতে শুরু করে।
দেশীয় রাজনীতিতেও রাইসির কট্টরপন্থী অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তার নির্বাচনের এক বছর পর ইরানে হিজাব এবং সতীত্ব আইনের প্রয়োগকে কঠোর করা হয়।
এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে নৈতিকতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর মাহসা আমিনি নামে এক তরুণ কুর্দি ইরানি মহিলা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান। এর প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ফলশ্রুতিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তাকর্মীদের হামলায় প্রায় ৫০০ জন নিহত হয়। এ সময় দেশব্যাপী আটক করা হয় ২২ হাজার মানুষকে।
তবে নিজের এ কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সমালোচনার মুখে পড়লেও ইরানের কট্টরপন্থীদের কাছে রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন ইব্রাহিম রাইসি। দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যু ইরানের জন্য বিরাট এক ধাক্কা। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক চলে আসছে ইরানের। ইব্রাহিম রাইসি ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় প্রতিবেশীদের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছিলেন।










