উন্নত সক্ষমতার একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের কথা জানিয়েছে ইরান। গতকাল স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরটি দেশটির নতুন সামরিক নীতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আওতায় তেহরান বলছে, কোনো হুমকি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। খবর এপি।
দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার কথা তুলে ধরেছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তিনি দাবি করেন, এটি একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে ‘পরীক্ষা’ করা হয়েছে। তবে যে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটিই নতুন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সলিড-ফুয়েলচালিত ‘কাসেম বাসির’ কিনা, তা স্পষ্ট নয়।
এর আগে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তিনটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। বিশেষজ্ঞরা ইরানের এ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপকে বিপজ্জনকভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখেছেন। কারণ এর আগে ছয় মাসের যুদ্ধে সমুদ্রে ইরানের হামলাগুলো মূলত বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো এসব হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইরানের বক্তব্য আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। গতকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কাসেম বাসির’ ক্ষেপণাস্ত্রটি ইরানের প্রতিরক্ষা কৌশলের ক্ষেত্রে ‘একটি মোড় পরিবর্তনের ঘটনা’।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ও নির্ভুলতা আগের তুলনায় বেশি এবং এতে আধা টন ওজনের একটি ওয়ারহেড রয়েছে। গত বছর ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথম প্রদর্শন করা হয়। তখন এর পাল্লা অন্তত ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার (৭৪৫ মাইল) বলে জানানো হয়েছিল।
বলা হয়ে থাকে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এবারের ইরানে হামলার অন্যতম কারণ। ওই হামলার পরই চলমান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়।
এদিকে গত রোববার হরমুজ প্রণালির কাছে জাহাজ চলাচলের জন্য ‘বহির্ভূত এলাকা’ বা ‘এক্সক্লুশন জোন’ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তেহরান। রেজায়ির ওই ঘোষণার জবাবে হোয়াইট হাউজ বলেছে, জলপথটি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
হোয়াইট হাউজ আরো জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করেছে এবং ইরানি নয় এমন বন্দরের দিকে যাওয়া জ্বালানি তেলবাহী জাহাজের চলাচল বাড়বে।
তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও অব্যাহত রয়েছে। এর মাধ্যমে ইরানের তেল রফতানি সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সোমবার পর্যন্ত ৯৪টি বাণিজ্যিক জাহাজকে অন্য পথে পাঠানো হয়েছে এবং তিনটি জাহাজ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
তেহরান চায়, জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তাদের নির্ধারিত একটি পথ অনুসরণ করুক। যুদ্ধ শুরুর আগে এই জলপথকে আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
রেজায়ি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সীমিতসংখ্যক জাহাজকে ওমানের উপকূলসংলগ্ন একটি বিকল্প পথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে সহায়তা করছে। তিনি বলেন, এসব জাহাজে জ্বালানি তেল থাকায় তেহরান সেগুলো ডুবিয়ে দিচ্ছে না। এর পেছনে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে বলে জানান তিনি।
হরমুজ প্রণালি ও জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যখন পরস্পরবিরোধী দাবি করে যাচ্ছে, তখন বৈশ্বিক বাণিজ্যবিষয়ক তথ্য প্রতিষ্ঠান কেপলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, গত সপ্তাহে এ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশ্বের জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও আবার ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
আবুধাবিতে বিশ্বনেতাদের এক ফোরামে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, ‘কোনো একক রাষ্ট্রের’ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের জ্বালানি রফতানি জিম্মি করা যাবে না। আমাদের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জিম্মি করা যাবে না।’
ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্র ইউএই যুদ্ধের সময় বারবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। গত মাসে দেশটি জানিয়েছিল, নতুন করে হামলার মুখে তারা তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে।














