গত এক সপ্তাহে ইরান প্রত্যক্ষ করেছে তার আধুনিক ইতিহাসের ভয়াবহতম সংঘর্ষ ও হত্যাযজ্ঞ। নিত্যপণ্যের দাম এবং মুদ্রা সংকটের জেরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসকগোষ্ঠী। ইরানের সরকারি হিসাবে, নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলা হলেও অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
তেহরানের বাজার থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুতই ছাত্র, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পানির অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত লোরদেগান ও আবদানানের মতো ছোট শহরগুলোতেও মানুষ গণহারে রাজপথে নেমে আসে। ৮ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে শুরু হয় নৃশংস অভিযান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আইআরজিসি নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর রাশিয়ান ভারী মেশিনগান ব্যবহার করেছে, যা ২০০৯ সালের বিক্ষোভ দমনের চেয়েও বহুগুণ বেশি ভয়াবহ।
অনেকে এই গণঅভ্যুত্থানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শেষ হিসেবে দেখলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শাসকগোষ্ঠী এখনো বেশ সুসংহত। তারা এই আন্দোলনকে ‘মোসাদের চক্রান্ত’ হিসেবে প্রচার করে বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিচ্ছে। এমনকি নিহতদের মৃতদেহ পরিবারকে না দিয়ে শোক পালনের অধিকারও কেড়ে নেয়া হচ্ছে, যাতে জনগণের মধ্যে চূড়ান্ত ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ইরানের ধনিক শ্রেণি ও বাজার ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ বিশৃঙ্খলা এড়াতে এখনো সরকারের পক্ষেই অবস্থান করছে।
ইরানের অধিকাংশ মানুষ শাসনব্যবস্থাকে ঘৃণা করলেও সরকার এখনো লক্ষাধিক সশস্ত্র সমর্থক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পূর্ণ আনুগত্য ধরে রেখেছে। ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণি ও প্রভাবশালী বাজারভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোও অস্থিতিশীলতার ভয়ে প্রকাশ্যে সরকারের বিরোধিতা করছে না।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিভক্ত বিরোধী শক্তি। সামাজিকমাধ্যমে সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভি দৃশ্যমান হলেও বাস্তবে তার সংগঠিত নেতৃত্ব বা মাঠপর্যায়ের কাঠামো নেই। তিনি যে ৫০ হাজার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বিদ্রোহ করেছেন বলে দাবি করেছিলেন, তার কোনো প্রমাণ মেলেনি। বরং পরিকল্পনা ও সমর্থন ছাড়া মানুষকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানানোয় অনেকের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। তার ‘এটা যুদ্ধ, আর যুদ্ধে প্রাণহানি হয়’ বক্তব্যটি অনেক ইরানির কাছে নিষ্ঠুর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মনে হয়েছে।
পাহলভি দাবি করেছিলেন যে, তার আহ্বানে ৫০ হাজার সরকারি কর্মকর্তা পক্ষত্যাগ করবেন, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া কুর্দি ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুরা পাহলভির উগ্র জাতীয়তাবাদী উপদেষ্টাদের প্রতি সন্দিহান। বিরোধীদের এই অভ্যন্তরীণ বিভাজন পরোক্ষভাবে বর্তমান সরকারকেই শক্তিশালী করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরান সরকারের ইন্টারনেট বন্ধ করার সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে, যা গণহত্যা আড়াল করা কঠিন করবে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বিরোধী নেতাকে এগিয়ে দেয়া উল্টো ক্ষতিকর হতে পারে।
ইরানে সাহসের অভাব নেই। অভাব আছে সংগঠিত নেতৃত্ব, কার্যকর কাঠামো এবং একটি যৌথ ভবিষ্যৎ রূপরেখার। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনি যেমন বিভিন্ন গোষ্ঠীকে একত্র করে একটি বিপ্লবী যন্ত্র তৈরি করেছিলেন, আজ ইরানে তেমন কেউ নেই। আর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়লেও তারা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়বে। এ লড়াই হবে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী। তাই কেবল সামাজিকমাধ্যমের প্রচারণা বা বক্তৃতা দিয়ে নয়, ইরানের মানুষের এখন প্রয়োজন বাস্তবসম্মত নেতৃত্ব এবং একটি ঐক্যবদ্ধ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।













