গাজার যুদ্ধ দিনের পর দিন আরো বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে—মৃতদেহ, ক্ষত-বিক্ষত অঙ্গ, আহত আর অনাহারীরা যেন এক অনিঃশেষ মানবিক বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। আর সেইসব বাস্তবতার সাক্ষী হচ্ছেন সাংবাদিকরা। মঙ্গলবার (১৩ মে) খান ইউনুসের ইউরোপীয় হাসপাতালে ইসরায়েলি বিমান হামলার সময় এক বিবিসি চিত্রগ্রাহক আহত হন। তিনি সেই মুহূর্তে শিশুদের মানবিক সংকট নিয়ে চিত্র ধারণ করছিলেন।
বিবিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থে ওই সাংবাদিকের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। সৌভাগ্যবশত তার আঘাত গুরুতর নয়। তবে ঘটনাস্থলে অনেকের মৃত্যু ও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হামাসের একজন শীর্ষ নেতা হাসপাতালের নিচে অবস্থান করছিলেন এবং তারা একটি ‘নির্দেশিত হামলা’ চালিয়েছে। তারা হামাসের বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণকে ‘নিষ্ঠুরভাবে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার’ করার অভিযোগ এনেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে হামাস।
হামলার সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিল অসুস্থ শিশুদের পরিবার। তাদের অনেকেই সন্তানদের বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঘটনাস্থলে এক আহত পিতার কান্নারত সন্তানদের শান্ত করতে দেখা যায় বিবিসি চিত্রগ্রাহককে। সেই ভিডিও এরইমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

মারাত্মক অপুষ্টির শিকার পাঁচ মাস বয়সী সিওয়ার। ছবি- বিবিসি
ঘটনার আগে ওই সাংবাদিক সিওয়ার আশুর নামের এক অপুষ্ট শিশুর দুঃখজনক অবস্থা নিয়ে কাজ করছিলেন। মাত্র পাঁচ মাস বয়সী সিওয়ার গাজা দক্ষিণের নাসের হাসপাতালে ভর্তি। মারাত্মক অপুষ্টি, চর্মরোগ ও অন্ত্রের জটিলতায় ভুগছে সিওয়ার। তার মা নাজওয়া বিবিসিকে বলেন, ‘সে আমার প্রথম সন্তান। আমি শুধু চাই, সে আবার আগের মতো সুস্থ হোক, খেলুক, বেড়ে উঠুক।‘
ইসরায়েলি অবরোধের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও শিশুদের বিশেষ দুধ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে জর্ডানিয়ান ফিল্ড হাসপাতাল থেকে তার জন্য কিছু দুধ পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে, কয়েক দিনের মধ্যেই বেশ কিছু অসুস্থ শিশুদের সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষও জড়িত। তারা যাত্রাপথে শিশুদের সঙ্গী পিতামাতার নিরাপত্তা যাচাই করে থাকেন।
এর আগে জানুয়ারিতে গাজায় বোমায় পা হারানো শিশুপুত্র আবদেল রাহমান ও তার মা আসমা চিকিৎসার জন্য জর্ডানে আসেন। মঙ্গলবার আম্মানে থাকা অবস্থায় আসমা গাজায় তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। আসমাকে তার মা ফোনে বলেন, ‘চারদিকে শুধু রকেট। খাবার নেই, জীবন অসম্ভব কঠিন। ময়দাও নেই, দাম আকাশছোঁয়া।‘

গাজায় নানীর সঙ্গে আটকে পড়েছে আসমার শিশুরা। ছবি- বিবিসি
আসমা বলেন, ‘আমি ফিরে গিয়ে ওদের নিরাপদ দেখতে পাই। মা আমার জন্য যা করছেন, তার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।‘ এরপর তিনি আর কিছু বলতে পারেননি, কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার সন্তানরাও রয়ে গেছে গাজায়।
এই যুদ্ধের মধ্যে মানবিক বিপর্যয় যে কতটা গভীর, তা কেবল সেই মায়ের চোখ দিয়েই বোঝা সম্ভব—যিনি দূরদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে নিজের সন্তানদের অনাহারে, আতঙ্কে দিন কাটাতে দেখছেন। আরো বোঝা যায়, কেন কেউ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার মতো জায়গায় আবার ফিরতে চাইতে পারে।








