মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত প্রতিরোধের মুখে দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে জান্তা বাহিনী। গত সাত মাসে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের অন্তত ৪৪টি শহরের পূর্ণ বা আংশিক দখল খুইয়েছে তারা। খবর রয়টার্স। 

সম্প্রতি স্পেশাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর মিয়ানমারের (এসএসি-এম) এক প্রতিবেদনে জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরিমাণ বেড়েছে। বিপরীতে সশস্ত্র জাতিগত বাহিনীগুলোর প্রতিরোধ বেড়েছে। 

এসএসি-এম বলছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রচুর শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এসব শহর দেশটির মোট আয়তনের ৮৬ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার (৫ কোটি ৫০ লাখ) ৬৭ শতাংশ শহরগুলোয় বাস করত। ফলে জান্তা বাহিনীর দুর্বলতা এখন আরো স্পষ্ট হয়েছে। 

মিয়ানমারের সশস্ত্র জাতিগত বাহিনী ও অভ্যুত্থানবিরোধী যোদ্ধাদের জোটকে পিপলস ডিফেন্স ফোরাম (পিডিএফ) বলা হয়। গত বছর জোট গঠনের পর থেকে তারা ‘অপারেশন ১০২৭’ অভিযান পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে তারা জান্তা বাহিনীর সামরিক ঘাঁটি, উত্তর ও পূর্বের চীন সীমান্তসংলগ্ন শহর এবং পশ্চিমের বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। 

এসএসি-এম বলছে, আন্তর্জাতিক সীমানাসংলগ্ন ৫১টি শহরের মধ্যে মাত্র একটিতে নিয়ন্ত্রণ আছে জান্তা বাহিনীর। অন্যদিকে ৩০টি শহরের অন্তত ৯০ শতাংশ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে তারা। আর ১৪টি শহরের পূর্ণ দখল নিয়েছে জান্তাবিরোধী পিডিএফ। 

উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং দেশটির নির্বাচিত সরকারপ্রধান অং সান সু চির বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান করেন। অভ্যুত্থানের পর দেশটির নাগরিকদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে জান্তা বাহিনী। ফলে সশস্ত্র প্রতিরোধের উত্থান হয়। মিয়ানমারের অবস্থা পর্যেবক্ষণ করা অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারের হিসাবে, চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত অন্তত ৫ হাজার ১৬১ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে এবং ২০ হাজার ৫০০ জনকে কারাগারে রাখা হয়েছে। 

এসএসি-এম বলছে, সামরিক জান্তাকে আইনগত বৈধ কিংবা কার্যত সরকার, কোনোটাই মনে করা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে সরকারের মৌলিক বৈশিষ্ট্যও নেই। কেননা, তারা দেশটির বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে না।

এদিকে জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি অলাভজনক সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সাত মাসে জাতিগত সশস্ত্র গ্রুপগুলো শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এ গোষ্ঠীগুলোই বছরের পর বছর জান্তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আসছিল। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হোর্সে বলেন, ‘যুদ্ধের মাধ্যমে গোষ্ঠীগুলো বহুল আকাঙ্ক্ষিত স্বশাসিত মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়েছে।’ 

জাতিসংঘের হিসাব বলছে, চলমান সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক গ্রামগুলোয় বিমান হামলা ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ আছে। অন্যদিকে পরিমাণে অল্প হলেও পিডিএফ গ্রুপের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ আছে। এসএসি-এম বলছে, দেশটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরো বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে সংঘাতের ঝুঁকি মোকাবেলার সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়।