ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে চলমান অভিযানে একাধিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সরঞ্জাম ব্যবহারের কথা নিশ্চিত করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর মার্কিন বাহিনীর নির্ভরতা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্ত্র উন্নয়ন ও সামরিক প্রযুক্তি তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে আসছে।
সামরিক প্রকল্প থেকে ইন্টারনেট
আধুনিক ইন্টারনেটের শিকড়ও একটি সামরিক প্রকল্পে। শীতল যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে নিরাপদ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে মার্কিন সামরিক অর্থায়নে তৈরি হয়েছিল আরপানেট। পরবর্তী সময়ে এ নেটওয়ার্ক থেকেই বাণিজ্যিক ইন্টারনেটের ভিত্তি তৈরি হয়।
যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা ও প্যালান্টিরের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টগুলো ক্রমেই মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান ব্র্যাড কুপার গত সপ্তাহে বলেন, উন্নত এআই সরঞ্জাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, যা প্রতিপক্ষের তুলনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
সামরিক ব্যবহারে বিগ ল্যাংগুয়েজ মডেল (এলএলএম) বিপুল পরিমাণ লেখা বিশ্লেষণ, সারসংক্ষেপ তৈরি, অনুবাদ ও ট্রান্সক্রিপশন করতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে এগুলো স্বয়ংক্রিয় বা অর্ধ-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থাকেও সহায়তা করতে পারে, যা মানুষের নির্দেশ ছাড়াই লক্ষ্য শনাক্ত ও আঘাত করতে সক্ষম।
তবে অধিকাংশ এআই কোম্পানির ব্যবহার নীতিতে এমন সামরিক প্রয়োগ সীমিত করা হয়েছে।
বিতর্ক ও সমালোচনা
মিডিয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের অভিযানে অ্যানথ্রোপিকের তৈরি এআই মডেল ক্লড ব্যবহার করা হয়েছিল। যদিও কোম্পানিটির নীতিমালায় নজরদারি, অস্ত্র উন্নয়ন বা সহিংসতা উসকে দেয়ার কাজে প্রযুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এদিকে প্যালান্টির টেকনোলজিসের সঙ্গে অ্যানথ্রোপিক অংশীদারত্ব করেছে বলে জানা গেছে। প্যালান্টিরের সফটওয়্যার মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ও বিভিন্ন ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার করে। তবে এআই নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিককে কালোতালিকাভুক্ত করেছে পেন্টাগন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মী সংগঠন মেড্যাক্ট সম্প্রতি প্যালান্টিরের সমালোচনা করেছে। যদিও প্যালান্টির যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা এনএইচএসের জন্য একটি ডেটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। একই সঙ্গে প্যালান্টির ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থায় এআই প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে, যা গাজা যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত হয়েছে। বহু বিশেষজ্ঞ ও অধিকার কর্মী এই যুদ্ধকে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন।
চলতি মাসের শুরুতে চ্যাটজিপিটির প্যারেন্ট কোম্পানি ওপেনএআই চুক্তিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারির কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
যুদ্ধ প্রযুক্তির দীর্ঘ ইতিহাস
প্রযুক্তি ও সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রযুক্তি কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস (আইবিএম) সামরিক বাহিনীর জন্য উচ্চগতির ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ক্যালকুলেটর তৈরি করেছিল, যা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নির্ধারণে ব্যবহৃত হতো।
আজকের অনেক সাধারণ প্রযুক্তিরও উৎস সামরিক। যেমন স্যাটেলাইটভিত্তিক ন্যাভিগেশন প্রযুক্তি গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস)।১৯৭০-এর দশকে নিখুঁতভাবে বোমা নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী তৈরি করেছিল এ প্রযুক্তি। ১৯৮০-এর দশকে প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয় এবং ১৯৯০–৯১ সালের গালফ যুদ্ধের সময় জিপিএস পরীক্ষা করা হয়।
ইন্টারনেটের বিকাশেও সামরিক গবেষণার প্রভাব রয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় ১৯৫৮ সালে অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (এআরপিএ) গঠন করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ১৯৬২ সালে সংস্থাটির একজন বিজ্ঞানী কম্পিউটার নেটওয়ার্কের ধারণা দেন, যা পরে ইন্টারনেটের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
সিলিকন ভ্যালি ও পেন্টাগনের সম্পর্ক
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধের সময় ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর ও হিউলেট-প্যাকার্ডের (এইচপি) মতো সিলিকন ভ্যালির কোম্পানিগুলো নাসা ও পেন্টাগনের সঙ্গে চুক্তি করে রাডার, মিসাইল গাইডেন্স ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তৈরি করেছিল।
সিআইএর তহবিলও পেয়েছে প্যালান্টির। কোম্পানিটির গোথাম সফটওয়্যার ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ সরঞ্জাম হয়ে ওঠে, যা নজরদারি তথ্য দ্রুত সার্চযোগ্য ডেটাবেসে রূপান্তর করতে পারে।
সাম্প্রতিক সামরিক প্রযুক্তি উদ্যোগ
২০১৭ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর প্রজেক্ট মেভেন চালু করে, যেখানে গুগলের এআই ব্যবহার করে ড্রোন ও স্যাটেলাইট চিত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
মাইক্রোসফটের সঙ্গে ২০২১ সালে যৌথভাবে তৈরি করা হয় ইন্টিগ্রেটেড ভিজ্যুয়াল অগমেন্টেশন সিস্টেম (আইভিএএস) হেডসেট, যা সৈন্যদের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়ায়।
পেন্টাগনের জয়েন্ট ওয়ারফাইটিং ক্লাউড ক্যাপাবিলিটি চুক্তির আওতায় অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (এডব্লিউএস) মার্কিন বাহিনীর জন্য নিরাপদ ক্লাউড অবকাঠামো পরিচালনা করছে। এছাড়া ২০২২ সালে বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্কের স্পেসএক্স দেশটির সামরিক বাহিনীর জন্য গুপ্তচর স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক স্টারশিল্ড তৈরি করে।










