লেবাননের এক পুরো প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে ইসরায়েলের যুদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ যুদ্ধ শুধু দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থাকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং সমাজে বৈষম্য আরো বাড়িয়ে জাতীয় ঐক্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেছে আল জাজিরা।

ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অনেক স্কুল ধ্বংস করেছে এবং লাখো শিক্ষার্থীকে বাস্তুচ্যুত করেছে। অসংখ্য হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, যা আগেই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ছিল।

লেবাননের স্কুলগুলো অনলাইন ক্লাস ও বিকল্প কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দেশটির শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী এখনো সেই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছে। হারানো সময় পুষিয়ে নিতে গিয়ে বিজ্ঞান ও গণিতের মতো বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে, অথচ নাগরিকত্ব বা সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিষয়গুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।

বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ে বিভক্ত লেবাননের মতো দেশে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। একাডেমিক গবেষক কার্লোস নাফাহ বলেন, একটি শিক্ষাব্যবস্থার মূল কাজ হলো নাগরিক তৈরি করা। আমরা এই বাস্তবতাকে স্বীকার করতে চাই না যে আমরা একটি পুরো প্রজন্ম হারিয়ে ফেলেছি।

অস্থায়ী সমাধানের চেষ্টা

দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে গত ২ মার্চ দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননে যুদ্ধ তীব্র করে ইসরায়েল। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরের চুক্তির পরও ইসরায়েল ১০ হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর জবাবে হিজবুল্লাহ হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরো অবনতি ঘটে।

ইউনেস্কোর তথ্যানুযায়ী, মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ স্কুলপড়ুয়া শিশু রয়েছে। শুধু শিক্ষার্থীরাই বাস্তুচ্যুত হয়নি, তারা যে স্কুলে পড়ত সেগুলোর অনেকগুলোও আর ব্যবহারযোগ্য নেই।

ইউনেস্কো জানিয়েছে, লেবাননের ৩৩৯টি স্কুল এখন যুদ্ধক্ষেত্র এলাকায় অবস্থিত। আরো শত শত স্কুল বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় আড়াই লাখ শিশুর শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। আরো ১০০টি স্কুল উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে, যেগুলোও শিগগির শিক্ষার্থীদের জন্য অপ্রবেশযোগ্য হয়ে যেতে পারে।

অনলাইন শিক্ষা, কিন্তু সবার নাগালে নয়

এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে চলে যাওয়ায় কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এটি কার্যকর হয়নি। কারণ ২০১৯ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো সংকটে দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আসফারি ইনস্টিটিউট ফর সিভিল সোসাইটি অ্যান্ড সিটিজেনশিপের জ্যেষ্ঠ গবেষক তালা আবদুলগানি বলেন, ২০১৯ সালের অক্টোবর বিপ্লব, কভিড-১৯, অর্থনৈতিক সংকট এবং এখন চলমান যুদ্ধ— এই ধারাবাহিক অস্থিরতার কারণে হাইব্রিড শিক্ষা লেবাননে প্রায় স্বাভাবিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু সীমিত ইন্টারনেট সুবিধা, বিদ্যুৎ সংকট, ডিভাইসের অভাব এবং অনিশ্চিত জীবনযাপনের কারণে এটি বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ফলে অনেক শিশু নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’

lebanon1_reuters

লেবাননের বাস্তুচ্যুত শিশুরা। ছবি: রয়টার্স

ইউনেস্কোর সহায়তায় লেবাননের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরো কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারী স্কুলে একাধিক শিফট চালু করা এবং অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

ইউনেস্কোর জ্যেষ্ঠ শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ মাইসুন চেহাব বলেন, ‘শিশুরা তাদের দৈনন্দিন রুটিন, স্থিতিশীলতা, বন্ধুত্ব এবং স্বাভাবিক জীবন হারাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘বারবার বাস্তুচ্যুতি, সহিংসতার অভিজ্ঞতা, চারপাশে যুদ্ধের পরিবেশ এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও মানসিক আঘাত সৃষ্টি করছে।’

বাড়ছে বৈষম্য

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন এনজিও সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু লেবাননের অর্থনৈতিক সংকট এবং বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

চেহাব বলেন, ‘দারিদ্র্য ভয়াবহভাবে বেড়েছে, যা টিকে থাকার সংগ্রামে থাকা পরিবারগুলোর ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করছে।’

তিনি যোগ করেন, ‘পরিবারগুলোকে এখন পরিবহন খরচ, খাবার, শীতের দিনে গরমের ব্যবস্থা কিংবা সন্তানদের ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত রাখার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।’

তার মতে, এই পরিস্থিতির ফলে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, যা শিশু শ্রম ও বাল্যবিবাহের হারও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চেহাব বলেন, ‘এমন সময়ে এই সংকট ঘটছে যখন মানবিক সহায়তার অর্থায়ন তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। আর শিক্ষা-সংকট বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে কম অর্থায়ন পাওয়া খাতগুলোর একটি।’

যুদ্ধের আগেই ভেঙে পড়েছিল শিক্ষা ব্যবস্থা

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর আগেই লেবাননের শিক্ষাব্যবস্থা সংকটে ছিল। বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দেশটির একসময়কার শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রায় ভেঙে পড়ে।

লেবানিজ সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, আয় বৈষম্য পরিমাপক জিনি সহগ ২০১১ সালে দশমিক ৩২ থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে দশমিক ৬১-এ পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে ইএসসিডব্লিউএর এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যপূর্ণ দেশের শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে রয়েছে লেবানন।

তালা আবদুলগানি বলেন, ‘যুদ্ধের প্রভাব দেশজুড়ে সমান নয়। এখন এমন এক শিক্ষা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে যেখানে কোনো শিশু শিক্ষার সুযোগ পাবে কি-না, তা নির্ধারণ করছে তার ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থসামাজিক অবস্থা।’

তিনি বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে বহু শিক্ষার্থী পুরোপুরি স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ তারা বাস্তুচ্যুত, অনিরাপদ অবস্থায় রয়েছে এবং তাদের স্কুলগুলো সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ এলাকায়।’

একের পর এক ধাক্কায় ভেঙে পড়ছে পুরো ব্যবস্থা

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকরাও এই যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবের শিকার হচ্ছেন। আবদুলগানি বলেন, ‘আমরা এমন এক অসম শিক্ষাব্যবস্থার জন্ম দেখতে পাচ্ছি, যেখানে কিছু শিশু শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারছে, আর অন্যরা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাবিচ্ছিন্নতা, মানসিক আঘাত ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক বাধা, অবকাঠামো ধস, দূরশিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং শিশু ও শিক্ষকদের ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ মানসিক চাপ।’

লেবাননের সরকারী শিক্ষকরা অনেক বছর ধরে জীবনধারনের উপযোগী বেতনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। কম বেতনের কারণে অনেকে অতিরিক্ত টিউশনি বা অন্য কাজ করতে বাধ্য হন। অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে তাদের আয় প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে।

চেহাব বলেন, ‘শিক্ষকরাই যেকোনো শিক্ষা ব্যবস্থার মূলভিত্তি, অথচ তারাই সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালের পর থেকে এ খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষক দেশ ছেড়েছেন অথবা পেশা বদল করেছেন।’

যুদ্ধের কারণে অনেক শিক্ষক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং জীবনহানির ঝুঁকিতে রয়েছেন। চেহাব বলেন, ‘একটি শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো একটি ধাক্কা সামাল দিতে পারে। কিন্তু এখানে বছরের পর বছর ধরে একের পর এক ধাক্কা এসে আঘাত করছে।’

‘গোটা একটি প্রজন্ম পিছিয়ে পড়বে’

বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশই মনে করেন, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী রিমা কারামি দক্ষ। তবে চলমান অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতির মতো কাঠামোগত সমস্যার কারণে আরো অনেক কিছু করা প্রয়োজন।

এক গবেষকের ভাষায়, পরিস্থিতি মোকাবেলায় দরকার ‘চিরাচরিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন সমাধান’।

আবদুলগানি সতর্ক করে বলেন, ‘সারাদেশব্যাপী কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে এবং পুরো একটি প্রজন্ম আরও পিছিয়ে পড়বে।’