ইয়েমেনের যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর এক দশকের বেশি সময় ধরে রিয়াদ এই সংঘাতের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের যে দ্রুত অগ্রযাত্রা ঘটেছে, সেটি কেবল আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজয় নয়। বরং একসঙ্গে কয়েকটি দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—সৌদি গোয়েন্দা ব্যবস্থার ব্যর্থতা, রিয়াদপন্থী ইয়েমেনি বাহিনীর ভঙ্গুরতা, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার সীমা এবং ইরানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে বাব এল-মান্দেব ঘিরে। হুথিরা ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে এগিয়ে মোখাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং প্রণালির মাঝখানের কৌশলগত পেরিম বা মাইয়ুন দ্বীপ দখল করেছে। এর ফলে প্রণালির ইয়েমেনি তীর এবং গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের ওপর অবস্থান তাদের আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক হুথি অগ্রযাত্রার তাৎপর্য ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের আগে গোয়েন্দা ব্যর্থতা

হুথিদের অভিযানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এর ব্যাপকতা সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের আগেভাগে বুঝতে না পারা। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা একজন কূটনীতিকের তথ্য অনুযায়ী, হুথিরা আক্রমণের আগে নীরবে প্রায় এক লাখ যোদ্ধা সমবেত করেছিল। এই সংখ্যা হুথিদের মোট সামরিক শক্তির হিসাব নয়; বরং সাম্প্রতিক অভিযানের জন্য বড় ধরনের বাহিনী জড়ো করার বিষয়টি বোঝায়। কিন্তু এত বড় প্রস্তুতি প্রতিপক্ষের নজর এড়িয়ে যাওয়াই সৌদি গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

চ্যাথাম হাউসের নিল কুইলিয়ামসহ কয়েকজন বিশ্লেষকের মূল্যায়নও একই দিকে—হুথিদের প্রস্তুতির সংকেতগুলো যথাসময়ে শনাক্ত করা হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল হিসাব। সৌদির ধারণা ছিল, হুথিদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অঘোষিত স্থিতাবস্থা এবং ইরানের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ ইয়েমেন সীমান্তে বড় ধরনের যুদ্ধ ফিরে আসার ঝুঁকি কমিয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের মধ্যে সেই হিসাব আর কার্যকর থাকেনি। বরং হুথিরা যুদ্ধের সময় ও স্থান নিজেরাই বেছে নিয়েছে।

তাদের আক্রমণ হয়েছে এমন একটি এলাকায়, যেখানে সৌদিপন্থী বাহিনীগুলো নিজেদের মধ্যে বিভক্ত এবং সামরিক কমান্ডও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। এর আগে লোহিত সাগরের এই অংশের অনেক বাহিনী ও অবকাঠামোর ওপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের শক্ত প্রভাব ছিল। সেই ব্যবস্থার জায়গায় সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন কমান্ড কাঠামো পুরোপুরি পরীক্ষিত হওয়ার আগেই বড় ধরনের হুথি আক্রমণের মুখে পড়ে। রয়টার্সকে পশ্চিমা, আঞ্চলিক ও ইয়েমেনি সূত্রগুলো বলেছে, বিভক্ত হুথিবিরোধী শিবির, সীমিত সৌদি বিমান সহায়তা এবং নতুন কমান্ড ব্যবস্থার দুর্বলতা—সবই হুথিদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে সৌদি মিত্ররা

ইয়েমেনে সৌদি আরবের সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরেই শুধু হুথিদের সামরিক শক্তি নয়; বরং নিজেদের মিত্রদের মধ্যে ঐক্যের অভাব। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের পক্ষে থাকা শিবিরে রয়েছে একাধিক শক্তি। প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের অধীন সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি আছে তারেক সালেহর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস, দক্ষিণাঞ্চলে সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল এবং মারিব অঞ্চলে প্রভাবশালী ইসলাহ-ঘনিষ্ঠ শক্তি। তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ ইয়েমেন সম্পর্কে ধারণা এক নয়। কেউ ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেন চায়, কেউ দক্ষিণের স্বাধীনতার পক্ষে। হুথিরা সেই বিভাজনের সুবিধাই নিয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিযানে কিছু সৌদিপন্থী ইউনিট কার্যত বড় ধরনের প্রতিরোধ ছাড়াই অবস্থান ছেড়ে দেয় বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলোর দাবি। তাদের পিছু হটার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সরবরাহ করা উন্নত অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের একটি অংশও হুথিদের হাতে পড়ে। এর তাৎপর্য শুধু নতুন অস্ত্র পাওয়া নয়। প্রতিপক্ষের যোগাযোগব্যবস্থা, সেন্সর, অস্ত্রের ধরন বা পরিচালনা পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সুযোগও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সামরিক পরাজয়টি দ্বিগুণ ক্ষতির কারণ হয়েছে—একদিকে ভূখণ্ড হারানো, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা।

ইরানের হাতে দুই দিক থেকে চাপ প্রয়োগের সুযোগ

হুথিরা ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত বাহিনী—এমন দাবি তেহরান বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের স্বাধীন মিত্র হিসেবে বর্ণনা করে। তবে হুথিদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ইরান এবং হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের ভূমিকার বিষয়ে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো ব্যাপকভাবে তথ্য দিয়েছে। সাম্প্রতিক মোখা অভিযানের ক্ষেত্রেও রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইয়েমেনি, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রগুলোর একাংশ দাবি করেছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড হুথিদের পরামর্শ ও সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে একজন ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, মোখা অভিযানের সিদ্ধান্ত হুথিদের নিজস্ব ছিল। ফলে সরাসরি কমান্ডের বিষয়টি বিতর্কিত হলেও এই অভিযানের ফল যে তেহরানের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করেছে, তা অনেক বেশি স্পষ্ট।

কারণ ইরানের এখন প্রতিপক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগের সম্ভাব্য দুটি সামুদ্রিক কেন্দ্র রয়েছে। হরমুজে চাপ সৃষ্টি হলে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেল পশ্চিম উপকূলে নিয়ে গিয়ে লোহিত সাগর দিয়ে রফতানির ওপর বেশি নির্ভর করতে পারে। কিন্তু বাব এল-মান্দেবও যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, সেই বিকল্পের কার্যকারিতাও কমে যায়। সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের ওপর হামলা এবং সেটির কার্যক্রমে বিঘ্নের কারণে। অর্থাৎ হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগরমুখী যে বিকল্প অবকাঠামো রিয়াদের কৌশলগত নিরাপত্তার একটি অংশ ছিল, সেটিও এখন সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে।

ওয়াশিংটনের ‘না’ সৌদির জন্য বড় বার্তা

তবে সৌদি আরবের জন্য হুথিদের ভূখণ্ড দখলের চেয়েও দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। হুথিদের অগ্রযাত্রার পর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে। ওয়াশিংটন সরাসরি মার্কিন হামলায় সম্মতি দেয়নি। পরে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও টার্গেটিং সহায়তার কথা জানিয়েছে।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে পর্দার আড়ালে। হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার পর ওমানে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। সেখানে হুথিরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু না করার কথা জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান আলাদাভাবে উপস্থাপন করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বৈঠকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। ওয়াশিংটনের হিসাব এখানে সৌদি হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।

সৌদি আরব হুথিদের অগ্রযাত্রাকে নিজের সীমান্ত, তেল অবকাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তার সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার নিজের বাহিনী ও জাহাজকে নতুন একটি যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে না আনা এবং বৃহত্তর ইরান সংঘাতকে আরও ছড়িয়ে পড়া থেকে ঠেকানোও হতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি নিরাপত্তা সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে—এমন প্রমাণ নয়। মার্কিন গোয়েন্দা ও টার্গেটিং সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু ঘটনাটি দেখাচ্ছে, সৌদি আরব আক্রান্ত হলেই যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরাসরি সামরিক অভিযানে নামবে—রিয়াদ এমন নিশ্চয়তা ধরে নিতে পারছে না।

মিসরের দিকে তাকিয়ে কেন সৌদি আরব

এই বাস্তবতাই মোহাম্মদ বিন সালমানকে কায়রোর দিকে তাকাতে বাধ্য করেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে আলোচনায় তিনি বাব এল-মান্দেব ও লোহিত সাগরে নিরাপদ নৌচলাচলের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সিসি সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় রিয়াদের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন। তবে মিসর সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কায়রোর জন্য দ্বিধার কারণও আছে।

সুয়েজ খাল মিসরের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাব এল-মান্দেব অস্থিতিশীল হলে সুয়েজের জাহাজ চলাচল কমে গিয়ে সরাসরি মিসরীয় অর্থনীতিতে আঘাত আসে। ফলে প্রণালিটি নিরাপদ রাখা মিসরের নিজস্ব স্বার্থ। কিন্তু ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে মিসরের রয়েছে বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক স্মৃতি। ১৯৬০-এর দশকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে মিসরের বড় সামরিক অভিযান দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে পরিণত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে কায়রো নতুন করে ইয়েমেনের স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক থাকতে পারে।

সৌদির সামনে এখন তিনটি কঠিন হিসাব

রিয়াদের জন্য সমস্যাটি হলো, কোনো পথই ঝুঁকিমুক্ত নয়। সীমিত সামরিক প্রতিক্রিয়া দিলে হুথিরা দখল করা অবস্থান সংহত করার সময় পেতে পারে। তাতে বাব এল-মান্দেবের ওপর তাদের প্রভাব সাময়িক সামরিক অর্জন থেকে স্থায়ী রাজনৈতিক দরকষাকষির অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে বড় ধরনের বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করলে হুথিরা সৌদি আরবের আরও গভীরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়াতে পারে। ইতিমধ্যে সৌদি শহর ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা হয়েছে এবং ১৫ সেপ্টেম্বর মক্কা ও জেদ্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করতে হয়েছিল।

তৃতীয় পথ আলোচনা। কিন্তু আলোচনাতেও হুথিদের অবস্থান এখন আগের তুলনায় শক্তিশালী। তারা হোদেইদা বন্দর ও সানা বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতি সৌদি সমর্থন কমানোর মতো বড় রাজনৈতিক দাবি তুলতে পারে বলে সাবেক মার্কিন আলোচক ডেনিস রসের মূল্যায়ন। ফলে রিয়াদের সামনে আসল প্রশ্ন এখন শুধু হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার নয়। প্রশ্ন হলো—কীভাবে হুথিদের সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাবের উৎস হতে না দেয়া যায়।

হুথিদের সাফল্য কতটা স্থায়ী

তবে হুথিদের বর্তমান অগ্রযাত্রাকে অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা ধরে নেয়াও ঠিক হবে না। দ্রুত ভূখণ্ড দখল করা আর দীর্ঘ সময় সেই ভূখণ্ড ধরে রাখা এক বিষয় নয়। বিশেষ করে উপকূলীয় সমতল এলাকায় তাদের নতুন অবস্থান সৌদি ও ইয়েমেনি বিমান হামলার জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত। সরবরাহ লাইন দীর্ঘ হবে এবং প্রতিপক্ষ পুনর্গঠিত হলে স্থলযুদ্ধের চরিত্রও বদলাতে পারে। তবু একটি বিষয় ইতিমধ্যেই বদলে গেছে—হুথিদের আঞ্চলিক মর্যাদা।

যে সংগঠনটি নব্বইয়ের দশকে উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় একটি জায়েদি পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়েছিল, সেটি আজ ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা ২০১৪ সালে সানা দখল করেছিল; এরপর প্রায় এক দশক সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা মোকাবিলা করেছে। সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা তাদের সেই বিবর্তনের আরেকটি ধাপ।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্রে নয়

সাম্প্রতিক ইয়েমেন সংকটের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সম্ভবত মোখা বা মাইয়ুন দ্বীপের মানচিত্রে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয়। গত কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি মৌলিক অনুমান ছিল—চূড়ান্ত সংকটে যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকবে। বর্তমান সংকট দেখাচ্ছে, সেই সমর্থন কতটা এবং কোন পরিস্থিতিতে পাওয়া যাবে, তা আর সব ক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত নয়।

অন্যদিকে ইরান দেখিয়েছে, সরাসরি সামরিক শক্তির পাশাপাশি সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠী, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন, তেল অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট—সবকিছুকে একই বৃহত্তর চাপ প্রয়োগের কাঠামোর মধ্যে ব্যবহার করা সম্ভব। হুথিদের অগ্রযাত্রা তাই ইয়েমেনে সৌদি আরবের জন্য একটি সামরিক ধাক্কা হলেও এর কৌশলগত অভিঘাত অনেক বিস্তৃত। রিয়াদের সামনে এখন শুধু হারানো এলাকা পুনর্দখলের প্রশ্ন নেই; তাকে একই সঙ্গে ঠিক করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কতটা নির্ভর করবে, মিসর ও অন্য আঞ্চলিক শক্তিকে কতটা সম্পৃক্ত করবে, হুথিদের বিরুদ্ধে কতদূর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করবে এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপথ কেমন হবে।

ইরানের জন্য হারানো প্রভাব ফিরে পাওয়ার সুযোগ

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ একাধিক ধাক্কা খেয়েছে। গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইরানঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো চাপের মধ্যে পড়েছে। ইয়েমেনে হুথিদের সাফল্য সেই প্রেক্ষাপটে তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানকে এর জন্য সরাসরি বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠাতে হয়নি। একটি স্থানীয় মিত্রগোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক সক্ষমতা তৈরি করে এখন এমন অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে তারা সৌদি আরবকে সরাসরি নিরাপত্তা সংকটে ফেলতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এটাই ইরানের প্রক্সি কৌশলের মূল সুবিধা—তুলনামূলক কম প্রত্যক্ষ সামরিক ব্যয়ে প্রতিপক্ষকে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে সম্পদ ছড়িয়ে দিতে বাধ্য করা। ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা যখন ইরানকে সরাসরি মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন তেহরানের ঘনিষ্ঠ শক্তিগুলো ইরাক থেকে ইয়েমেন ও লোহিত সাগর পর্যন্ত নতুন চাপের ক্ষেত্র তৈরি করছে। যা রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সৌদির জন্য সংকট শুধু সামরিক নয়

এই পরিস্থিতি মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য বিশেষভাবে জটিল, কারণ গত কয়েক বছর ধরে তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো। এর পেছনে অর্থনৈতিক যুক্তিও ছিল। ভিশন ২০৩০-এর মাধ্যমে সৌদি অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনোদন, ক্রীড়া, শিল্প ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে রিয়াদ। এ ধরনের রূপান্তরের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা।

কিন্তু ইয়েমেন থেকে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, লোহিত সাগরের নৌপথে অনিশ্চয়তা এবং সৌদি তেল অবকাঠামোর ওপর হামলার ঘটনা সেই স্থিতিশীলতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে।

১৫ সেপ্টেম্বর ইয়ানবুতে অপরিশোধিত তেল লোডিংয়ে বিঘ্ন এবং সৌদির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার পর ইউরোপমুখী কিছু চালান বাতিল করতে হয়। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। হরমুজ সংকটের সময় এই পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনই সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। ফলে একই সময়ে হরমুজ, ইয়ানবু এবং বাব এল-মান্দেবের নিরাপত্তা নিয়ে সংকট তৈরি হওয়া রিয়াদের জন্য একটি জটিল জ্বালানি-নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করেছে।

রয়টার্স অবলম্বনে