হোয়াইট হাউসের ভেতরে 'গাজা রিভিয়েরা' নামে একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য গাজায় অত্যাধুনিক মেগাসিটি গড়ে তোলা, এমনটি বলা হলেও তবে সমালোচকরা এই পরিকল্পনাকে 'পাগলাটে' এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে সেখানকার জনগণকে বৃহৎ পরিসরে জাতিগতভাবে নির্মূল করার একটি কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পে গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষকে জোরপূর্বক স্থানান্তরের মাধ্যমে একটি মার্কিন ট্রাস্টির অধীনে গাজাকে পুনর্গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।

এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে গ্রেট (GREAT), যার প্রতিটি বর্ণের অর্থ দাড়ায় গাজার পুনর্গঠন, অর্থনৈতিকভাবে ত্বরান্বিতকরণ এবং একটি রূপান্তর ট্রাস্টের পরিকল্পনা। এতে গাজাকে একটি বন্দরনগরীতে রূপান্তরের প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে থাকবে আটটি এআই-চালিত উচ্চ প্রযুক্তির মেগাসিটি। তবে সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো, গাজার সমস্ত জনগণকে ‘অস্থায়ীভাবে’ সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব, যা বাস্তবে জাতিগত নির্মূলের সমান।

পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যারা গাজা ছেড়ে যাবে, তাদের জমির বিনিময়ে 'ডিজিটাল টোকেন' দেয়া হবে, যা তারা অন্য দেশে নতুন জীবন শুরু করতে ব্যবহার করতে পারবে। যারা থেকে যাবে, তাদের জন্য মাত্র ৩২৩ স্কয়ার ফুটের ক্ষুদ্র আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা গাজার বর্তমান আবাসন ব্যবস্থার তুলনায়ও অত্যন্ত সীমিত।

মানবাধিকার সংস্থা ট্রায়াল ইন্টারন্যাশনাল এই পরিকল্পনাকে ‘উন্নয়নের ছদ্মবেশে গণহত্যার নকশা’ বলে অভিহিত করেছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ গ্রান্ট বলেন, ‘এটি একটি জাতিগত নির্মূলের নকশা, যা আন্তর্জাতিক অপরাধের পাঠ্যবইয়ে স্থান পাবে: জোরপূর্বক জনসংখ্যা স্থানান্তর, জনতাত্ত্বিক প্রকৌশল এবং সম্মিলিত শাস্তি।’

এছাড়া, নিউ ইয়র্কের সেন্টার ফর কনস্টিটিউশনাল রাইটস এর আইনজীবী ক্যাথরিন গ্যালাঘার সতর্ক করেছেন যে, এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়তে পারে।

এই পরিকল্পনার ভাষা ও কাঠামো স্পষ্টভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইলন মাস্ক এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো ব্যক্তিত্বদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তৈরি। প্রকল্পে 'ইলন মাস্ক ম্যানুফাকচারিং পার্ক' এবং ‘আব্রাহামিক অ্যালি’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।

অন্যদিকে গাজার কৃষিজমিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তায় বাফার জোনে পরিণত করার প্রস্তাবও রয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের জীবিকা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। এছাড়াও প্রকল্পে গাজা, ইসরায়েল ও মিশরের মধ্যে কোনো সার্বভৌম সীমার উল্লেখ নেই; বরং সেখানে ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’ নয়, ‘ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সত্তা’ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

হামাসের সিনিয়র কর্মকর্তা বাসেম নাইম স্পষ্টভাবে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে বলেন, ‘গাজা রিভিয়েরা' প্রকল্পটি উন্নয়নের নামে একটি ভয়ঙ্কর মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু গাজার জনগণের অস্তিত্বের ওপর হুমকি নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালার বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ। গাজা বিক্রয়ের বস্তু নয়—এটি একটি জাতির আবাসভূমি। এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সচেতনতা ও প্রতিরোধ জরুরি।’