ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাসনের স্থায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। যদি বর্তমান ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটে, তবে ইরানের ক্ষমতায় কে আসবে?

আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ ও ইরানবিরোধী শিবিরের নেতাদের মতে, এ প্রশ্নের উত্তর মোটেও সহজ নয়। ক্ষমতার পরিবর্তন শাসন ব্যবস্থার পতনের প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। বিশেষ করে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী বিভক্ত হবে, নাকি ঐক্যবদ্ধ থাকবে, সেটিই হবে বড় নিয়ামক।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের সিনিয়র ফেলো বেহনাম বেন তালেবলু ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, ‘শুধু শাসন ব্যবস্থার পতনই যথেষ্ট নয়, বরং তা কীভাবে ঘটছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা দেশগুলো যেন কেবল ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের রদবদল বা কসমেটিক পরিবর্তনের ফাঁদে না পড়ে।’

তিনি মিসর বা ভেনিজুয়েলার মতো মডেলের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা গেছে, ক্ষমতার শীর্ষে পরিবর্তন এলেও নিরাপত্তা বাহিনী ঠিকই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

তালেবলু মনে করেন, ইরানের বিরোধী দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজপথের আন্দোলনকে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ভবিষ্যৎ মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বাসিজ মিলিশিয়া ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর ভূমিকার ওপর ঝুলে আছে। যদি নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন অংশ বিদ্রোহ করে বা আদেশ মানতে অস্বীকার করে, তবেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব। অন্যথায় ধর্মীয় নেতাদের বিদায় ঘটলেও ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি সশস্ত্র বাহিনীর হাতেই থেকে যেতে পারে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ বেনি সাবতি বলেন, ‘আইআরজিসি জেনারেলরা সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টাও করতে পারেন। ইরানের রাজনীতিতে ক্যারিশমা বা নেতৃত্বের আকর্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক সশস্ত্র বাহিনীপ্রধান হাবিবুল্লাহ সায়ারি কিছুটা সমালোচনা করলেও তিনি বড় নেতা হতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’

অন্যদিকে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাসিত বিরোধী ব্যক্তিত্ব রেজা পাহলভির অনুসারীরা বেশ আশাবাদী। পাহলভি নিজেকে একজন ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ইরানের প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি বারবার বলছেন, ইরানের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা কী হবে তা জনগণই স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করবে।

পাহলভি নিজে কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছেন না বলে দাবি করেন। ইরানি-আমেরিকান সাংবাদিক বানাফশে জান্দ মনে করেন, এ মুহূর্তে পাহলভিই একমাত্র গ্রহণযোগ্য নেতা যিনি বর্তমান পরিবর্তনকে নেতৃত্ব দিতে পারেন।

মরিয়ম রাজাভির নেতৃত্বাধীন পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন (এমইকে) মনে করে, ইরানের পরিবর্তন বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপে আসবে না। রাজাভি বলেন, ‘কেবল একটি সংগঠিত জাতীয় প্রতিরোধই এ শাসন ব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। তার দল একটি অন্তর্বর্তীকালীন ছয় মাসের সরকারের প্রস্তাব দিয়েছে, যারা পরবর্তী সময়ে একটি মুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান রচনা করবে।’

বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। বেহনাম বেন তালেবলু সতর্ক করে জানিয়েছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত হবে না নির্বাসিত দলগুলোর মধ্য থেকে কাউকে আগেভাগে পছন্দের তালিকায় রাখা। কারণ বৈধতা অবশ্যই ইরানের ভেতর থেকেই আসতে হবে।

ইরানে খামেনি-পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে এখন পর্যন্ত কোনো একক নাম নিশ্চিতভাবে উঠে আসেনি। বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা কোনো স্প্রিন্ট নয়, বরং দীর্ঘ এক ম্যারাথনের সঙ্গে তুলনা করছেন। যেখানে চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করবে সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর।