মহামারীর শুরুতেই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা সামনে আসে। যদিও এটি প্রকট আকার ধারণ করে মূলত ২০২১ সালে। একদিকে কভিডজনিত লকডাউন-সম্পর্কিত উত্পাদন বাধা, অন্যদিকে তুমুল ভোক্তা চাহিদা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় তৈরি করে। সেসময়ই মূলত এটি মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। এরপর চলতি বছর ইউক্রেন যুদ্ধ এবং নতুন করে চীনে লকডাউন সরবরাহকে আরো জটিল করে তোলে। দেশে দেশে রেকর্ড পর্যায়ে উন্নীত হয় মূল্যস্ফীতি। তবে সম্প্রতি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধীর হওয়ার আশা দেখাচ্ছে।

চলমান সরবরাহ ব্যবস্থায় দুঃস্বপ্নের কারণে অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। এমনকি এ কারণে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হয়েছে বেশ কিছু দেশ। যুক্তরাষ্ট্রে জুনের একটি সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে দেশটিতে চার দশকের উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রায় অর্ধেকের জন্য বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত দায়ী। তবে বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা শিথিল হতে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি ধীর হতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো উচ্চমূল্যের ব্যাথা দূর হতে কত সময় লাগবে?

শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা স্বাভাবিকের পর্যায়ে আসতে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। কারণ গত কয়েক বছর ধরে সমুদ্রে পণ্য পরিবহন করা শিল্পটি চরম অবস্থার মধ্যে রয়েছে। যেখানে চাহিদা সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। তবে আশার কথা হলো গত কয়েক মাস ধরে এ পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পণ্য পরিহনের খরচও নিম্নমুখী হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পট রেট কমে যাচ্ছে। এটিই স্বাভাবিকের দিকে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও স্বল্প সময়ের ব্যবধানে যেভাবে শিপিং রেটে উল্লম্ফন হয়েছে, কমার ক্ষেত্রে সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। এজন্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ডেনিশ শিপিং জায়ান্ট মায়েরস্ক দ্বিতীয় প্রান্তিকের আয়ের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আশার চলতি বছরের শেষ দিকে সমুদ্রে কনটেইনার পরিবহন ব্যয় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে।

মায়েরস্কের এ বক্তব্যে কিছুটা আশাবাদী হওয়া গেলেও এক্ষেত্রে ব্যাপক অনিশ্চয়তাও রয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি হয়তো সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ কমাতে সহায়তা করছে। তবে এখনো উপকরণ, যন্ত্রপাতি ও গাড়ি সরবরাহে জট রয়ে গিয়েছে। যদিও সবকিছু ছাপিয়ে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ আশা করছেন, কনটেইনার পরিবহন ব্যয় কমতে চলেছে। তবে এ বছরের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে যাবে- এমনটা আশা করা কঠিন। চলমান সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাঘাত ২০২৩ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

যেমন পশ্চিমের ব্যস্ততম লস অ্যাঞ্জেলেস বন্দরে মহামারীজনিত যানজট কমছে। তবে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়ে গিয়েছে। বন্দরটিতে পণ্য খালাসের জন্য সমুদ্রে অপেক্ষমান জাহাজের সংখ্যা ১৯টিতে নেমে এসেছে। যেখানে গত জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ১০৯টি।

তাছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরায় স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি ব্যবসাগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে এটি যেন নতুনভাবে কোন প্রতিবন্ধকতায় না পড়ে। সোর্সিং ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ডন তিউরা একটি নোটে বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে সরবরাহ ব্যবস্থা একক কোন বিষয় নয়। এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িয়ে থাকে। এটি কেবল শিপিং, উত্পাদন, ট্রাক কিংবা রেলে পণ্য পরিবহন নয়। বরং এ বিষয়গুলোর সমষ্টিই হলো সরবরাহ ব্যবস্থা। সুতরাং এর মধ্যে কোন একটি বিষয় প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়লে সেটি পুরো ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে। বছরের চতুর্থ প্রান্তিকের মধ্যে এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে এমন আশাবাদ করা কঠিন। কারণ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে সময় না লাগলেও এটি স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। আমরা এখনো জানি না যে ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে।

এছাড়া সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসবে বিষয়টি তেমন নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছর ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমার আশা করা বোকামি হবে। সম্প্রতি শিপিং ব্যয় কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এতে ব্যবসাগুলোর ওপরে চলমান চাপ কিছুটা কমবে। এরপরে এটি ভোক্তা পর্যায়ে আসবে। সরবরাহ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পর মূল্যস্ফীতি ধীর হওয়া শুরু হতে এক বছর থেকে ১৮ মাস সময় লাগবে। দেশভেদে এ সময় আরো বেশিও লাগতে পারে। সবমিলিয়ে আগামী বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মূল্যস্ফীতি চাপ ধীর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।