পোল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ভ্রৎসলাভের কাছে একটি সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভোরবেলা থেকেই ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। তাদের মধ্যে কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চাকরিজীবী, কেউবা অবসরপ্রাপ্ত। পুরুষ-নারী, তরুণ-বৃদ্ধ সবাই সেখানে এসেছেন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে, আর তা হলো-সশস্ত্র হামলা থেকে নিজেদের রক্ষার কৌশল শেখা।

‘ট্রেইন উইথ দ্য আর্মি’ নামে এ কর্মসূচির আওতায় প্রতি সপ্তাহান্তে পোলিশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সাধারণ মানুষকে আগ্নেয়াস্ত্র চালানো, হাতাহাতি লড়াই, প্রাথমিক চিকিৎসা ও গ্যাস মাস্ক পরার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

কর্মসূচির সমন্বয়ক ক্যাপ্টেন অ্যাডাম সেলিকি বলেন, ‘সময় এখন খুব বিপজ্জনক। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। রাশিয়া থেকে সামরিক হুমকি রয়েছে। তাই আমরা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাই সরকার এখন পরিকল্পনা করছে, যাতে দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এই প্রশিক্ষণ নিতে পারেন।’

পোল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থানই এর উদ্বেগের অন্যতম কারণ। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েরই প্রতিবেশী দেশ এটি। নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখে পোলিশ সরকার চলতি বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশ ব্যয় করছে প্রতিরক্ষায়—যা ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

পোল্যান্ডের সশস্ত্র বাহিনীতে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার সেনা সদস্য রয়েছে। সরকার এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৫ লাখে উন্নীত করতে চায়, যার মধ্যে রিজার্ভ সেনাও থাকবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী হবে পোল্যান্ড।

পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়তে চাই। এ লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুদ্ধবিমান, নৌযান, ক্ষেপণাস্ত্রসহ আধুনিক অস্ত্র কিনছে পোল্যান্ড।’

New Project (4)

প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করছে পোল্যান্ড সরকার। ছবি: বিবিসি

তবে ওয়াশিংটনের প্রতি দীর্ঘদিনের আস্থার জায়গাটিতে কিছুটা সন্দেহ ঢুকে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহার সংক্রান্ত বক্তব্য ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি তার ইতিবাচক মনোভাব পোলিশ নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করেছে। সাম্প্রতিক এক সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথও বলেন, ‘ইউরোপ যেন ধরে না নেয় যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি এখানে চিরস্থায়ী।’

পোল্যান্ডে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র পূর্বাঞ্চলীয় শহর জেসজো থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি সরানোর ঘোষণা দিয়েছে। বলা হয়েছে, সেনারা পোল্যান্ডের মধ্যেই অন্যত্র মোতায়েন হবে। তবুও এ সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এ কারণে পোল্যান্ড এখন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। শিগগিরই ফ্রান্সের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। এমনকি ফ্রান্সের পারমাণবিক সুরক্ষার ছাতার নিচে আসার কথাও ভাবছে পোল্যান্ড।

ন্যাটোতে পোল্যান্ডের স্থায়ী প্রতিনিধি ও প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা টমাস শাটকভস্কি বলেন, ‘আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র পোল্যান্ডকে হারাতে চাইবে না। কিন্তু আমরা বিকল্প ভাবতে বাধ্য হচ্ছি ও নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে।’

এদিকে নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগে তৈরি হচ্ছে ব্যক্তিগত বাঙ্কারও। শেল্টারপ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান জানুশ জানচি বলেন, ‘আগে মাসে দুই-একটা ফোন আসত। এখন প্রতি সপ্তাহে ডজনখানেক ফোন পাই। মানুষ রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করছে।’

তবে পোল্যান্ডের সাধারণ মানুষ কি সত্যিই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত? সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরু হলে মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক সেনাবাহিনীতে স্বেচ্ছায় যোগ দিতে চান। আর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দেশ ছেড়ে পালানোর কথা বলেছেন।

তবুও যাদের অতীতে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে, তারা বলছেন—প্রস্তুত থাকাই সবচেয়ে জরুরি। ৯৮ বছর বয়সী যুদ্ধপ্রবীণ ভান্ডা ট্রাচিক-স্তাভস্কা বলেন, ‘রাশিয়ার আগ্রাসন ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে। আমরা যদি প্রস্তুত না থাকি, তাহলে আবারো পরাধীন হতে হবে। অস্ত্রই শেষ ভরসা।’ – বিবিসি অবলম্বনে