২৫১ সপ্তাহ বা পাঁচ বছর ধরে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ধর্মঘট করে অনন্য নজির গড়েছেন সুইডেনের এক স্কুল শিক্ষার্থী গ্রেটা থুনবার্গ। সম্প্রতি স্কুলজীবনের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে ধর্মঘটের সাময়িক বিরতি টেনেছেন পরিবেশবাদী আন্দোলনে কীর্তি গড়া এ অতি পরিচিত মুখটি।
গ্রেটা থুনবার্গ সুইডেনের এক স্কুল শিক্ষার্থী, যিনি ১৫ বছর বয়সে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অবিলম্বে কার্যকর প্রদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে সুইডেনের সংসদের বাইরে প্রতিবাদ শুরু করেন। তখন থেকে তিনি জলবায়ুবিষয়ক কর্মী হিসেবে বৈশ্বিক পরিচিতি পান। ২০১৮ সালের আগস্টে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এ প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রচার মাধ্যমে প্রচুর সাড়া ফেলে তার এ আন্দোলন। ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ ১১২টি দেশের প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী তার ডাকে সাড়া দিয়ে জলবায়ু সংরক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে।
গ্রেটা থুনবার্গ তার এ কার্যক্রমের জন্য অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ২০১৯ সালের মার্চে নরওয়ের তিন সংসদ সদস্য তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্যও মনোনীত করেন।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিতে তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছেন এমন একজন কর্মী থুনবার্গ। গত শুক্রবার সুইডেনের উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এর পর পরই তিনি জানিয়েছেন, এটা হতে যাচ্ছে তার সর্বশেষ বিদ্যালয় ধর্মঘট। থুনবার্গ বলেন, ‘২০১৮ সালে যখন আমি ধর্মঘট শুরু করি, তখন আমি কখনই আশা করতে পারিনি, এতে কিছু হবে।’
বিশ্বমঞ্চে পাঁচ বছরের আন্দোলনে থুনবার্গ তার সমবয়সীদের একত্র করেছেন। তিনটি বই লিখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়া ‘জলবায়ু সংকট’ ও বিশ্ব উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে শীর্ষ অর্থনীতির নেতাদের ব্যবসা পদ্ধতির ব্যাপারে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
গ্রেটা থুনবার্গ জানিয়েছেন, পরবর্তী শুক্রবারগুলোতেও বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা তার রয়েছে। কিন্তু স্নাতক হওয়ার কারণে এটিকে এখন আর ‘স্কুল ধর্মঘট’ হিসেবে গণ্য করা হবে না।
সুইডেনে ৬-১৬ বছর বয়সের মধ্যে শিশুদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। অধিকাংশ সুইডিশ শিক্ষার্থী ১৯ বছর বয়সে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ করেন। পরিবেশবাদী আন্দোলন করতে গিয়ে ২০ বছর বয়সী থুনবার্গ এক বছর তার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, থুনবার্গ ২০১৮ সালে ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। ওই সময়ে তিনি সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে একটি ছোট গ্রুপের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিন সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন বিক্ষোভ করেন। শুরুতে তারা প্রতি শুক্রবার বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, অবশেষে ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ গ্রুপ তৈরি করে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক নিবন্ধে গ্রেটা থুনবার্গ লিখেছিলেন, ‘আমি ক্ষমতায় থাকা লোকদের দিকে তাকাই এবং ভাবি কীভাবে তারা এত জটিল জিনিস তৈরি করছে। আমি শুনেছি মানুষ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি অস্তিত্বের হুমকি। তার পরও মানুষ এমনভাবে চলছে, যেন কিছুই হয়নি। আমরা আর পুরনো নিয়ম মেনে বিশ্বকে বাঁচাতে পারব না, নিয়ম পরিবর্তন করতে হবে।’
তরুণ শিক্ষার্থী হিসেবে থুনবার্গের কণ্ঠস্বর ও স্পষ্টতা বিশ্বকে আকর্ষণ করেছিল। ফলে ২০১৯ সালে প্রতি মহাদেশে যুব নেতৃত্বে জলবায়ু আন্দোলনের একটি দিনের পথ প্রশস্ত করে।
আয়োজকরা অনুমান করেছেন, বিশ্বব্যাপী কয়েক হাজার শহরের প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। শিশু ও তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার দাবিতে ব্যাপকভাবে বিক্ষোভে নামে ওই সময়ে।
গত ফেব্রুয়ারিতে থুনবার্গ দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছিলেন, ‘পৃথিবী প্রতিদিন আরো খারাপ হচ্ছে। এখন আমাদের আরো সমর্থক আছে, যারা জলবায়ু আন্দোলন, জলবায়ু ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইয়ে সক্রিয় ও জড়িত।’
বিদ্যালয় জীবন শেষ করার প্রেক্ষাপটে থুনবার্গ এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘আমরা শুরু করার পর থেকে অনেক কিছুই বদলে গেছে। তবে এখনো অনেক পথ বাকি। কেননা আমরা এখনো ভুল দিকে এগোচ্ছি। এখানে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের ক্ষুধা, লাভ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মোড়কে প্রান্তিক ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং এ পৃথিবীকে বলিদানের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। ফলে পৃথিবী এক নিয়ন্ত্রণহীন পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’














