ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা নিয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প কলম্বিয়ায় সরকার পতনের হুমকি দিয়েছেন, কিউবাও পতনের মুখে বলে দাবি করেছেন। ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে উদ্বেগের মাত্রা আরো বাড়িয়েছে গ্রিনল্যান্ড ঘিরে তার মন্তব্য। ট্রাম্প স্পষ্ট বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন।’ ন্যাটো সুরক্ষিত অঞ্চলের বিষয়ে এ ধরনের প্রকাশ্য অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও অস্বস্তিতে ফেলেছে। গ্রিনল্যান্ড ইস্যু, ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান, কলম্বিয়া-কিউবাকে প্রকাশ্য হুমকি—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ও পদক্ষেপগুলোকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেখছে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির দৃষ্টিতে।

গতকাল এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প অভিযোগ তোলেন, কলম্বিয়া সরকার কোকেন তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করে। ট্রাম্প দাবি করেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো খুব বেশি দিন টিকতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালাবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘শুনতে ভালোই লাগছে।’ একই আলোচনায় ট্রাম্প জানান, কিউবার পতনও অনিবার্য। তিনি বলেন, ‘কিউবার এখন কোনো আয় নেই। তারা সব পেয়েছে ভেনিজুয়েলা ও তেলের ওপর নির্ভর করে।’

‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন’ বলে ট্রাম্প আবারো দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থান ও খনিজ সম্পদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দরকার এবং ডেনমার্ক এটি আটকাতে পারবে না।’ এদিকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে হুমকি দেয়া বন্ধ করতে বলেছেন। মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ড দখল করা প্রয়োজন, এমন কথা বলার কোনো অর্থ নেই। ড্যানিশ কিংডমের অন্তর্ভুক্ত তিনটি ভূখণ্ডের কোনোটিকেই দখল করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের নেই। ডেনমার্ক ন্যাটোর সদস্য। সেই সূত্রে গ্রিনল্যান্ডও ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় পড়ে।’

মার্কিন আদালতে মাদুরো, সুর নরম করল ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার: যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে বন্দি ভেনিজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন ফেডারেল কোর্টে তোলা হয়েছে। মাদক পাচারের অভিযোগে দায়ের করা মামলার শুনানিতে হাজির করতে গতকাল স্থানীয় সময় সকালে ব্রুকলিনের আটক কেন্দ্র থেকে কঠোর নিরাপত্তায় মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে হেলিকপ্টারে আদালতে আনা হয়। এদিকে মাদুরোকে আটক করার ঘটনায় প্রথমে কঠোর প্রতিবাদ জানালেও শেষ পর্যন্ত সুর নরম করেছে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকার। দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সম্মানজনক সম্পর্ক ও সহযোগিতামূলক কর্মসূচি’ গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন।

মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আড়ালে একটি আন্তর্জাতিক কোকেন পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এ নেটওয়ার্কের লেনদেনে জড়িত ছিল মেক্সিকোর সিনালোয়া ও জেটাস কার্টেল, কলম্বিয়ার সাবেক গেরিলা সংগঠন ফার্ক ও ভেনিজুয়েলার কুখ্যাত ‘ত্রেন দে আরাগুয়া’ গ্যাং। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো এসব অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছেন। তার ভাষায়, এগুলো ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদের ওপর পশ্চিমা প্রভাব বিস্তারের কৌশল।

মাদুরোকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া হলেও তার দীর্ঘদিনের সঙ্গীরা এখনো দেশ পরিচালনায় রয়েছেন। প্রথম দিকে তারা মাদুরোর আটক অভিযানকে ‘ঔপনিবেশিক তেল দখল’ ও ‘অপহরণ’ আখ্যা দিয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানান। কিন্তু কিছু সময় পর সুর পাল্টান অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ। রোববার টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক ও সহযোগিতামূলক আলোচনায় যেতে তারা প্রস্তুত। রদ্রিগেজের ভাষায়, ‘আমরা শান্তি, সংলাপ ও সহযোগিতা চাই। আমাদের জনগণ ও পুরো অঞ্চল যুদ্ধ নয়, স্থিতিশীলতা প্রাপ্য।’

‘চাভিস্তা’ আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত রদ্রিগেজকে রাজনৈতিকভাবে আগ্রাসী এবং একই সঙ্গে বাস্তববাদী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। বাম ঘরানার ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হলেও তিনি অর্থনীতিতে বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের জন্য পরিচিত। মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার প্রথম মন্তব্যে রদ্রিগেজ বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা হয়েছে। এটা ঔপনিবেশিক শক্তির তেল লুটের পাঁয়তারা।’ কিন্তু রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেন, কারাকাসের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কথা না শুনলে ভেনিজুয়েলায় আবার হামলা চালানো হবে। ট্রাম্পের এমন হুমকির পর নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ইঙ্গিত দেন রদ্রিগেজ। ট্রাম্পের হুমকির পর রোববার রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যৌথ উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করতে চাই, যাতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্থায়ী পরিবেশ তৈরি হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমাদের জনগণ ও অঞ্চল যুদ্ধ নয়, শান্তি ও সংলাপের দাবিদার।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিরোধী ডেমোক্র্যাট নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, এ বিষয়ে কংগ্রেসকে পূর্ণাঙ্গভাবে অবহিত করা হয়নি। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে এ ধরনের সামরিক অভিযানের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও তার সমর্থকদের বড় একটি অংশ এটিকে দ্রুত, কার্যকর এবং প্রায় ‘বিনা ক্ষতিতে’ অর্জিত কৌশলগত সাফল্য হিসেবে প্রচার করছে।