দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতে পৃথক কোনো সেল বা উইং নেই। এমনকি জাতীয় সংসদেও এ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে সংরক্ষিত আসন বা বিশেষ ব্যবস্থার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মাত্র একটিতে প্রতিবন্ধীবিষয়ক উইং বা সেল রয়েছে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় বক্তারা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
আজ সোমবার রাজধানীর বারিধারায় হোটেল অমনি রেসিডেন্সিতে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাসের (বি-স্ক্যান) আয়োজনে ‘ডিজেবিলিটি ইনক্লুসিভ ইলেকশন রিপোর্টিং’ শীর্ষক দিনব্যাপী এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ইউরোপিয়ান পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসির (ইপিডি) সহযোগিতায় ‘প্রোমোটিং ডিজেবিলিটি ইনক্লুসিভ ইলেকশন অবজারভেশন’ প্রকল্পের আওতায় কর্মশালাটির আয়োজন করা হয়। এতে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল গণমাধ্যমের ২০ জন সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং এটি তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও নির্বাচনী ইশতেহারে এ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের করুণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন না করে অধিকারধারী নাগরিক হিসেবে বিবেচনার মানসিকতা তৈরি করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক সনদে (সিআরপিডি) স্বাক্ষর করলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২২ সালে সিআরপিডি কমিটির সুপারিশে আইনগত বৈষম্য দূর করা, ভোটকেন্দ্রের প্রবেশগম্যতা বাড়ানো, ভোটের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পূর্ণ অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনো ধীরগতির।
কর্মশালায় সিআরপিডির ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদের নতুন সাধারণ নির্দেশনার আলোকে নির্বাচনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ও সামাজিক বাধা দূর করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি সংবাদ নির্বাচন, শিরোনাম সম্পাদনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ছবি ব্যবহার এবং নির্বাচনী প্রবেশগম্যতা নিয়ে বিভিন্ন কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করা হয়।
বক্তারা বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ভোটার ও প্রার্থীদের অংশগ্রহণের বিষয়েও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভোটার ও প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন, তাদের জন্য রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশন কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব প্রশ্ন আগেভাগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলতে হবে। এতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৃশ্যমানতা বাড়বে।
কর্মশালায় প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অধিকারভিত্তিক সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। নির্বাচনী প্রবেশগম্যতাসংক্রান্ত তথ্য ও প্রমাণ যাচাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করা এবং অধিকার ও জবাবদিহিতার বিষয় অনুসন্ধানের ব্যবহারিক অনুশীলন করেন সাংবাদিকরা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সংবাদে সম্পৃক্ত করার পদ্ধতিও শেখানো হয়। এ ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকারদাতার সম্মতি, মর্যাদাপূর্ণ ভাষা ও যথাযথ শব্দচয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
কর্মশালায় বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব, প্রোগ্রাম পরিচালক ইফতেখার মাহমুদ, প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর মাহফুজুর রহমান রাকীব, প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট কোঅর্ডিনেটর উপমা সাহা এবং অ্যাডমিন অফিসার রুমা আক্তার উপস্থিত ছিলেন। ইপিডির পক্ষে প্রকল্প পরিচালক আনাস্তাসিয়া এস উইবাওয়া ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার রোকসানা হক অংশ নেন।
কর্মশালাটি পরিচালনা করেন মিডিয়া বিশ্লেষক ও গবেষক নাজিয়া আফরিন মোনামী এবং দৈনিক ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার ও সম্পাদকীয় বিভাগের সাংবাদিক রাবেয়া বেবী। সমাপনী বক্তব্য দেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ডেলিগেট সিমোনা কামোলিনি।
বি-স্ক্যানের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বাচনী অংশগ্রহণ নিয়ে গণমাধ্যমে দয়া বা সহানুভূতিনির্ভর উপস্থাপনার পরিবর্তে মানবাধিকার, সমতা ও নাগরিক অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবাদিকতা নির্বাচনী গণতন্ত্রে এ জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং মর্যাদাপূর্ণ উপস্থাপনা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।










