সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এমন এক সংকটের মুখে পড়েছেন, যেখানে চারপাশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই তার প্রতিকূলে যাচ্ছে। উত্তরে ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াদের হামলার শিকার হয়েছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন। দক্ষিণে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূল ধরে অগ্রসর হচ্ছে এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। পূর্বে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই তিন সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সৌদি আরব। আর এর প্রভাব পড়ছে এমন এক পরিকল্পনার ওপর, যার সঙ্গে এমবিএস তার নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনেকটাই জুড়ে দিয়েছেন—ভিশন ২০৩০।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৌদি আরবকে দূরে রেখে দেশের ভেতরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন এমবিএস। ২০১৬ সালে ঘোষিত ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্য ছিল তেলের ওপর দেশটির নির্ভরতা কমানো। পর্যটন, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া, বিনোদন, নতুন শহর নির্মাণ ও বিপুল বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতির নতুন ভিত্তি তৈরির কথা ছিল এতে। তবে এসব পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত ছিল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা।

কিংস কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রভাষক রব গেইস্ট পিনফোল্ডের ভাষায়, এমবিএসের পুরো কৌশলই এমন একটি স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশ তৈরির ওপর নির্ভরশীল ছিল, যাতে সৌদি আরব দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক রূপান্তরে মনোযোগ দিতে পারে। এখন সেই কৌশলই নজিরবিহীন হুমকির মুখে পড়েছে।

নিরাপত্তা সংকটের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক অভিঘাত পড়েছে জ্বালানি খাতে। হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা এবং বাব আল-মানদেবে হুথিদের হুমকির কারণে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এ পাইপলাইন হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—দুই ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ দেয়। কিন্তু সেটিতেও হামলা হয়েছে। ফলে পশ্চিম উপকূলের সৌদি শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমানোর প্রয়োজন হতে পারে।

সামরিক পথও রিয়াদের জন্য সহজ নয়। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের পর বহু বছর যুদ্ধ করেও সৌদি আরব হুথিদের পরাজিত করতে পারেনি কিংবা নিজের পছন্দমতো কোনো রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দিতে পারেনি। এক পর্যায়ে রিয়াদ বুঝতে পারে, একই সঙ্গে দেশের ভেতরে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক সংস্কার এবং বাইরে ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন।

এরপরই পরিবর্তন আসে সৌদির আঞ্চলিক নীতিতে। ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয় রিয়াদ। হুথিদের সঙ্গেও উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চলে। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌদি বন্দর অবরোধের হুমকি দেয় হুথিরা। এরপর পরিস্থিতি আবার দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে।

গালফ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্রিস্টিয়ান আলেকজান্ডারের মতে, হুথিদের সৌদি আরবকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। সীমিত ও হিসাব করে চালানো হামলার মাধ্যমেই তারা রিয়াদের অর্থনৈতিক ব্যয় বাড়াতে, নিরাপত্তার ওপর আস্থা দুর্বল করতে এবং এমবিএসকে আলোচনায় চাপ দিতে পারে। একই সঙ্গে এসব হামলা সৌদি আরবকে সুরক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতাও সামনে আনতে পারে।

এমবিএসের সমস্যাটি এখানেই। হুথিদের চাপের মুখে ছাড় দিলে এমন বার্তা যেতে পারে যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে সৌদি নীতিকে প্রভাবিত করা সম্ভব। আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযানে গেলে তাকে ইয়েমেনের সেই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে ফিরে যেতে হতে পারে, যেখান থেকে কয়েক বছর ধরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে রিয়াদ।

পরিস্থিতি আরো জটিল করেছে সৌদি মিত্রদের অবস্থান। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়ে এমবিএস মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেছিলেন বলে জানিয়েছে টেলিগ্রাফ। যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্যসহ বিভিন্ন সহায়তা দিলেও রিয়াদের চাওয়া সামরিক হামলায় সম্মত হয়নি ওয়াশিংটন। ব্রিটেন সামরিক উপদেষ্টা পাঠালেও প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

একসময় ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। কিন্তু এখন আবুধাবি ও রিয়াদের সম্পর্কও আগের মতো ঘনিষ্ঠ নয়। ফলে সংকটের সময়ে ঐতিহ্যগত মিত্রদের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পুরনো সৌদি কৌশলও কার্যকর হচ্ছে না।

এর মধ্যেই নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। ভিশন ২০৩০-এর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ১০৬ মাইল দীর্ঘ আয়নাঘেরা শহর ‘দ্য লাইন’-এর পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট করতে হয়েছে।

অবশ্য সব বিশ্লেষক পরিস্থিতিকে এমবিএসের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন না। বাহরাইনের গালফবিষয়ক বিশ্লেষক আহমেদ আলখুজাইয়ের মতে, দ্য লাইনের মতো প্রকল্প ছোট করা কিংবা পিআইএফের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেয়া ব্যর্থতার লক্ষণ নয়; বরং বাজার বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা। মিত্রদের কাছে সহায়তা চাওয়াকেও তিনি আতঙ্ক নয়, স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কূটনীতি হিসেবে দেখছেন।

একইভাবে বর্তমান সংকট এমবিএসের ক্ষমতার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকিও নয়। প্রায় এক দশকে তিনি সৌদি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় করেছেন এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকটাই প্রান্তিক করে দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, তার ক্ষমতা নড়বড়ে হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

কিন্তু বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও সম্ভবত তার সিংহাসন নয়। ঝুঁকিটি ভিশন ২০৩০ নিয়ে।

বহু বছর ধরে এমবিএস এমন একটি সৌদি আরবের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চেয়েছেন, যা অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিনিয়োগ, পর্যটন ও স্থিতিশীলতার নিরাপদ দ্বীপ হিসেবে থাকবে। সেই ধারণার ওপর দাঁড়িয়েই তেলনির্ভরতা কমিয়ে নতুন অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এখন যুদ্ধ সৌদি আরবের সীমান্তের আরো কাছে এসেছে, জ্বালানি অবকাঠামো হামলার শিকার হচ্ছে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে পুরনো মিত্রদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা মিলছে না।

ফলে এমবিএসের সামনে বড় পরীক্ষা এখন ক্ষমতা ধরে রাখা নয়; বরং ক্রমেই ব্যয়বহুল ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠা একটি আঞ্চলিক পরিবেশের মধ্যে তার অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্বপ্ন কতটা পূরণ সবে সেটাই। টেলিগ্রাফ