ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ চতুর্দশ লিওর সঙ্গে চলমান বিরোধের মধ্যেই নিজেকে যিশুর মতো ‘উদ্ধারকর্তা’ রূপে দেখানো একটি এআই-তৈরি ছবি প্রকাশ করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে তিনি সেই পোস্টটি সরিয়ে নেন। খবর আল জাজিরা।
নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গত রোববার ছবিটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তাকে সাদা পোশাক পরিহিত অবস্থায় একজন মানুষের মাথায় হাত রেখে আরোগ্য দানরত ভঙ্গিতে দেখা যায়, যা যিশুখ্রিস্টের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় চিত্রের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
এর আগে তিনি পোপ লিওকে ‘অপরাধ দমনে দুর্বল’ এবং ‘পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থ’ বলে সমালোচনা করেন।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ছবিটি মূলত তাকে ‘একজন চিকিৎসক বা রেড ক্রস কর্মী’ হিসেবে উপস্থাপন করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘শুধু ভুয়া সংবাদমাধ্যমই ছবিটিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, এমন কোনো পোপ চান না ‘যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেন।’
অন্যদিকে পোপ লিও গতকাল আলজেরিয়ার উদ্দেশে যাত্রার সময় সাংবাদিকদের বলেন, তিনি এই বিতর্কে জড়াতে চান না। তবে তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি, সংলাপ এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বে আজ অসংখ্য মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, নিরীহ মানুষ নিহত হচ্ছে। কারো না কারো তো বলতে হবে—এর চেয়ে ভালো পথ আছে।’
ভ্যাটিকান-হোয়াইট হাউজ উত্তেজনা
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি, সামরিক পদক্ষেপ এবং ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে হোয়াইট হাউজ ও ভ্যাটিকানের মধ্যে সম্পর্ক কয়েক মাস ধরেই টানাপড়েনে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথলিক চার্চের শীর্ষ নেতারাও ট্রাম্পের মন্তব্যের সমালোচনা করেন।
আর্চবিশপ পল এস কোয়াকলি বলেন, ‘পবিত্র পোপকে নিয়ে এমন অবমাননাকর মন্তব্য আমাকে ব্যথিত করেছে। পোপ কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন।’
লাস ভেগাসের আর্চবিশপ জর্জ লিও থমাস বলেন, ‘পোপ এমন এক সময়ে সত্য কথা বলছেন, যখন তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য ‘গ্রহণযোগ্য নয়’। তার ভাষায়, ‘পোপ শান্তির আহ্বান জানাবেন—এটাই স্বাভাবিক এবং যথাযথ।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
রক্ষণশীলদের মধ্যেও সমালোচনা
শুধু ধর্মীয় মহল নয়, রক্ষণশীল অনেক ব্যক্তিত্বও ট্রাম্পের এআই-তৈরি ছবিটির সমালোচনা করেন।
রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক উপদেষ্টা ব্রাইলিন হলিহ্যান্ড বলেন, ‘এটি জঘন্য ধর্ম অবমাননা। বিশ্বাস কোনো প্রচারণার বিষয় নয়।’
ফক্স নিউজ উপস্থাপক রাইলি গেইনস প্রশ্ন তোলেন, ‘তিনি কি সত্যিই এমনটা বিশ্বাস করেন?’ তিনি বলেন, ‘একটু বিনয় তার জন্য ভালো হতো।’
ডেইলি ওয়্যারের কলামিস্ট মেগান বাশাম এটিকে ‘চরম ধর্ম অবমাননা’ বলে উল্লেখ করে ট্রাম্পকে পোস্ট সরিয়ে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। একই প্রতিষ্ঠানের ইসাবেল ব্রাউনও একে ‘অগ্রহণযোগ্য ও আপত্তিকর’ বলেন।
ডেমোক্র্যাটদের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের আচরণকে ‘অহংকারপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। তিনি বলেন, ‘পোপ যখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তখন ট্রাম্প তাকে আক্রমণ করছেন এবং নিজেকে এক ধরনের মসীহরূপে উপস্থাপন করছেন—এটি শুধু আপত্তিকর নয়, বরং আত্মকেন্দ্রিক আচরণ।’
ট্রাম্পের খ্রিস্টান ভোটব্যাংক ও অতীত বিতর্ক
ট্রাম্প নিয়মিত গির্জায় যান না। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি খ্রিস্টান ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন পান—বিশেষ করে ক্যাথলিকদের মধ্যে তিনি প্রায় ৫৬ শতাংশ ভোট পান।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক হত্যাচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যাওয়ার পর তার কিছু সমর্থক ঘটনাটিকে ‘ঈশ্বরের সুরক্ষা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

পোপ চতুর্দশ লিও। ছবি: রয়টার্স
এর আগেও পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুর পর ট্রাম্প নিজেকে পোপের মতো দেখানো একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়।
এদিকে বিশপ রবার্ট ব্যারন বলেছেন, পোপ লিওর কাছে ট্রাম্পের ক্ষমা চাওয়া উচিত, তবে একই সঙ্গে ক্যাথলিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য তার কিছু প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেন।
অবশ্য ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তারা শুরু থেকেই তাদের বক্তব্যে ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীক ব্যবহার করে আসছেন। তারা অনেক সময় এই সংঘাতকে শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক লড়াই হিসেবে না দেখিয়ে নৈতিক বা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও উপস্থাপন করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ‘ধর্মীয় বয়ান’ যুদ্ধকে আরো আবেগপ্রবণ ও বিভাজনমূলক করে তোলে। এর ফলে বিষয়টি কৌশলগত সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে সরে গিয়ে বিশ্বাস ও পরিচয়ের প্রশ্নে রূপ নেয়।
এ নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন মহলে অসন্তোষও দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, যুদ্ধের যুক্তি ধর্মীয় আবরণে আনা হলে তা বাস্তব পরিস্থিতির জটিলতা আড়াল করে এবং ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি বাড়ায়।










