মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে ইয়েমেন ও সৌদি আরব। ইয়েমেনে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি বাহিনী। অন্যদিকে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, সামরিক ঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রাখার দাবি করেছে ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী। একই সঙ্গে পশ্চিম ইয়েমেনে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন ফ্রন্টে দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে লড়াইয়ের পাশাপাশি বিমান হামলাও চলছে। এর মধ্যে মক্কা নগরীর দিকে ড্রোন হামলার চেষ্টার অভিযোগ ঘিরে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রিয়াদ একে ‘রেড লাইন’ অতিক্রমের চেষ্টা হিসেবে দেখলেও হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি গতকাল জানান, সৌদি আরবের লোহিত সাগর-তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ তেলবন্দর ইয়ানবু এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটিতে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলাগুলো ঠিক কখন হয়েছে, তা তিনি জানাননি। এর আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা জারি করেছিল। সৌদি সরকার ও রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো এসব হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

একই সময়ে ইয়েমেনে হুথি অবস্থানে সৌদি বিমান হামলাও তীব্র হয়েছে। ইয়াহিয়া সারির দাবি, চলতি সপ্তাহে ইয়েমেনে প্রায় ৪৫০টি বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি বাহিনী। সৌদি সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারাও তাদের ও সৌদি বাহিনীর বিমান অভিযানের কথা স্বীকার করেছেন। তবে রিয়াদ সরাসরি এসব অভিযানের বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি।

হুথিরা গত কয়েক দিনে লোহিত সাগর উপকূলের বেশ কয়েকটি এলাকা দখল করে বাব আল-মান্দেব প্রণালির মুখে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত বাহিনীর কাছ থেকে সাঁজোয়া যান দখলের ভিডিও প্রকাশ করেছে গোষ্ঠীটি। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যপথ বাব আল-মান্দেব ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ আরো বেড়েছে।

এর মধ্যেই সৌদি আরব জানিয়েছে, মক্কার দক্ষিণে একটি হুথি ড্রোন ভূপাতিত করেছে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনটি পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ধ্বংস করা হয়। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকি একে ইসলামের পবিত্র স্থানের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সৌদি আরব বলেছে, মক্কা তাদের জন্য ‘রেড লাইন’। তবে হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি মক্কা লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছেন এবং সৌদি অভিযোগকে প্রচারণার অংশ বলে দাবি করেছেন।

ঘটনার পর পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) পবিত্র স্থানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এপিকে বলেছেন, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে সামরিক সহায়তার জন্য সৌদি আরব তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়নি।

হুথিরা একই সঙ্গে ইয়েমেনের মারিব প্রদেশে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে। তবে তারা কোনো প্রমাণ দেয়নি এবং সৌদি পক্ষও এ দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় সৌদি আরবে নিজেদের সরকারি কর্মীদের চলাচলেও নতুন বিধিনিষেধ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইয়েমেন সীমান্তের ২০ মাইলের মধ্যে মার্কিন সরকারি কর্মীদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও পরিকল্পনায় সহায়তা দিলেও এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিকভাবে নতুন এ সংঘাতে জড়ায়নি।

ইয়েমেনের সংঘাতের বিস্তার বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের পাশাপাশি হামলার পর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনও বন্ধ রয়েছে। একই সময়ে বাব আল-মান্দেব ঘিরে হুথিদের অগ্রযাত্রা লোহিত সাগরপথে তেল ও পণ্য পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৮ ডলারের আশপাশে ছিল।