আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মানচিত্র। আর এ পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে এসেছে গ্রিনল্যান্ড। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝখানে অবস্থান করা এ দ্বীপটি এখন ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা, আকাশ প্রতিরক্ষা, নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত খনিজ সম্পদের কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর নজরের কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতায় গ্রিনল্যান্ড ক্রমেই আর্কটিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হচ্ছে।
গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ কেন
কানাডার উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা উত্তর মেরু রেখার ভেতরে অবস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষায় এ দ্বীপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তৎকালীন নাৎসি জার্মানির দখল থেকে মুক্ত রাখতে এবং আটলান্টিক মহাসাগরের জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে অবস্থান নেয়।
তবে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ পাতলা হওয়ায় নতুন নৌপথ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন পথ খুলেছে। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো নর্দার্ন সি রুট ও ভবিষ্যৎ ট্রান্স-পোলার রুট। নর্দার্ন সি রুট মূলত রাশিয়ার উত্তর উপকূল ধরে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, যা সুয়েজ খালের তুলনায় পণ্য পরিবহনের সময় ও দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। আর ট্রান্স-পোলার রুট পুরোপুরি আর্কটিক মহাসাগরের মধ্য দিয়ে সরাসরি ইউরোপ-এশিয়া সংযোগের সম্ভাবনা তৈরি করছে। এসব রুট চালু হলে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মানচিত্র বদলে যেতে পারে এবং গ্রিনল্যান্ড হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ নৌ চলাচলের কৌশলগত কেন্দ্র।
নিরাপত্তা হুমকি ও শক্তির প্রতিযোগিতা
আর্কটিক ও উত্তর ইউরোপকে ঘিরে পশ্চিমা সামরিক কৌশলে যে ধারণাটি ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো ‘নর্দার্ন ফ্ল্যাঙ্ক’। এই ধারণার মূল কথা—উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সামগ্রিক প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়বে। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার পর এই উত্তরাঞ্চলকে ঘিরে সামরিক পরিকল্পনা আরো সুসংহত হয়েছে। এর ফলে গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং ন্যাটোর উত্তর দিকের প্রতিরক্ষা বলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০১৮ সালে চীন নিজেকে ‘আর্কটিক নিকটবর্তী রাষ্ট্র’ হিসেবে দাবি করে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায়। এ সময় তাদের ‘পোলার সিল্ক রোড’ পরিকল্পনার মাধ্যমে উত্তর মেরু অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত যোগসূত্র তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র তখন এ উদ্যোগের সমালোচনা করে জানায়, তারা বিষয়টি ‘দক্ষিণ চীন সাগরের’ মতো সামরিকীকরণের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
একই সময়ে রাশিয়া আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সক্রিয় হয়। অঞ্চলটি রাশিয়ার নর্দার্ন ফ্লিটের ঘাঁটি এবং সোভিয়েত আমলে সেখানে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষাও চালানো হয়েছিল। রুশ সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে সেই পরীক্ষার স্থান আবার প্রস্তুত করা সম্ভব। ২০১৪ সালের পর থেকে রাশিয়া সেখানে একাধিক সামরিক ঘাঁটি চালু করেছে এবং পুরোনো সোভিয়েত অবকাঠামো ও বিমানঘাঁটি পুনর্গঠন করছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, আর্কটিকে ন্যাটোর তৎপরতা নিয়ে মস্কো উদ্বিগ্ন এবং প্রয়োজনে সেখানে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো হবে। যদিও তিনি বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পথ খোলা রাখার কথাও বলেছিলেন।

গ্রিনল্যান্ডের থিউলে এয়ার বেসে সাদা গলফ-বলের মতো গম্বুজের ভেতরে থাকা রাডার ইউনিটটি আকাশ স্ক্যান করে বিদেশী সামরিক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তে কাজ করে ( ছবি: ইউএস আর্মি কর্পস অব ইঞ্জিনিয়ার্স)
আকাশ প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা
গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বের বড় অংশই আসে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়। আর্কটিকের ওপর দিয়ে উত্তর আমেরিকার দিকে ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য উড়ানপথ তুলনামূলকভাবে ছোট এবং সরাসরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থায় গ্রিনল্যান্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে পিটুফিক স্পেস বেসের রাডার ও স্পেস নজরদারি সক্ষমতা সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ শনাক্ত, ট্র্যাকিং এবং প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার জন্য সময় তৈরি করে। অর্থাৎ এই দ্বীপের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য একটি আগাম সতর্কতা বলয় হিসেবে কাজ করে—যা আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুগে উত্তর আমেরিকার নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান।
আকাশ প্রতিরক্ষার দিক থেকেও গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে একটি ‘ফরোয়ার্ড পজিশন’। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে দীর্ঘ পাল্লার বোমারু বিমান, নজরদারি বিমান কিংবা সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে এখানকার উপস্থিতি কার্যকর সুবিধা দেয়। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় আকাশপথে নিকটবর্তী সংঘর্ষ বা ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকিও বাড়ছে—এমন পরিস্থিতিতে রাডার কভারেজ, টহল এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে গ্রিনল্যান্ড শুধু সমুদ্রপথ নয়, আকাশপথেও উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ডের থিউলে এয়ার বেসের আর্লি ওয়ার্নিং রাডারটি আর্কটিক দিক থেকে উৎক্ষেপিত সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক উড়োজাহাজ আগেভাগে শনাক্ত ও ট্র্যাক করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি
গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিটুফিক স্পেস বেস’ কৌশলগতভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫১ সালে ডেনমার্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির পর এ বেস স্থাপন করা হয়। এ ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এছাড়া গ্রিনল্যান্ড উত্তর আটলান্টিকের অত্যন্ত কৌশলগত ‘জিআইইউকে গ্যাপ’—গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মধ্যবর্তী সামুদ্রিক করিডর—এর নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ‘জিআইইউকে গ্যাপ’ হলো উত্তর মেরু ও আর্কটিক অঞ্চল থেকে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে প্রবেশের প্রধান সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট। এ অঞ্চলটি প্রাকৃতিক চোকপয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এখানে নজরদারি জোরদার থাকলে রুশ নৌবাহিনীর চলাচল, বিশেষ করে সাবমেরিনসহ গোপন সক্ষমতার নৌযানগুলোর গতিবিধি আগেভাগেই শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
খনিজ সম্পদের গুরুত্ব
প্রতিরক্ষার পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের মাটির নিচে থাকা বিরল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিনল্যান্ডে যে খনিজগুলো পাওয়া যায় বা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোকে একত্রে বলা হয় ক্রিটিক্যাল মিনারেলস। যেগুলো ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি কার্যত অচল। গ্রিনল্যান্ডে সবচেয়ে আলোচিত খনিজ হলো বিরল মৃত্তিকা উপাদানবা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস। এর মধ্যে নিওডিমিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, ডাইস্প্রোসিয়াম ও টার্বিয়ামের মতো উপাদান ব্যবহৃত হয় স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, উইন্ড টারবাইন, আধুনিক রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র নির্দেশনা ব্যবস্থায়। সামরিক প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি—দুই ক্ষেত্রেই এসব খনিজ অপরিহার্য।

বিরল খনিজের কারণেও গ্রিনল্যান্ড বিভিন্ন বিশ্বশক্তির বিশেষ নজর কাড়ছে
এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে গ্রাফাইট রয়েছে, যা লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অ্যানোড তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, মোবাইল ফোন ও শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থায় গ্রাফাইট ছাড়া আধুনিক ব্যাটারি কল্পনাই করা যায় না। এ খনিজগুলোর বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের বড় অংশ বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে। রেয়ার আর্থ মিনারেলস উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের এই একচ্ছত্র আধিপত্য পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো বিকল্প উৎস হিসেবে গ্রিনল্যান্ডের দিকে আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
দ্বীপটির প্রায় ৫৬ হাজার অধিবাসীর বেশিরভাগই ইনুইট সম্প্রদায়ের। আর তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি সচেতন। বর্তমানে গ্রিনল্যান্ড শুধু একটি দ্বীপই নয়। বরং আর্কটিক অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। তাই বিশ্লেষকরা বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপটিকে ঘিরে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন।

গ্রিনল্যান্ডের অজ্ঞাত এক স্থানে অনুশীলনে ডেনমার্কের সেনাসদস্যরা
ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। সম্প্রতি ডেনমার্ক এ অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি জোরদারে প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ পরিকল্পনার আওতায় তিনটি নতুন আর্কটিক নৌযান, নজরদারি ড্রোন এবং স্যাটেলাইট সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুউকে ডেনমার্কের ‘জয়েন্ট আর্টিক কমান্ড’ এর সদর দপ্তর অবস্থিত। এছাড়া এই দুর্গম অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে ডেনমার্কের অভিজাত নৌ ইউনিট ‘সিরিয়াস ডগ স্লেজ প্যাট্রোল’ নিয়মিত টহল দেয়। ডেনমার্ক সম্প্রতি মার্কিন সেনাদের তাদের দেশে যাতায়াতের অনুমতি দিলেও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের ওপর কোনো সার্বভৌমত্বের আঘাত আসলে তারা নিরাপত্তা চুক্তি পুনর্বিবেচনা করবে।










