গত বছরের এ সময়ে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল জর্জিয়া। সেসময় বিক্ষোভ দমনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে সরকার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া স্থগিতের সিদ্ধান্তে রাজধানী তিবিলিসির সড়কে নেমে আসা বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমনে ব্যবহৃত জলকামানে ওই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।

ভুক্তভোগী এক বিক্ষোভকারী জানান, জলকামানের পানিতে এমন এক রাসায়নিক ছিল, যার স্পর্শে চামড়ায় তীব্র জ্বালা লাগে, যা ধুয়ে ফেললেও সহজে চলে যায় না। এসব স্প্রে বা পানিতে আক্রান্ত হয়ে অনেকে দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্ট, কাশি, মাথাব্যথা ও বমি সমস্যায় ভুগেছেন। কারো কারো এসব উপসর্গ ৩০ দিনেরও বেশি স্থায়ী হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।

167826e0-cb84-11f0-9fb5-5f3a3703a365

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের তদন্তে, জলকামানের পানিতে ‘ক্যামাইট’ নামের একটি রাসায়নিক মেশানোর আলামত পাওয়া গেছে। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাবাহিনী তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে এর দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি বিবেচনা করে ১৯৩০-এর দশকের দিকে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরিবর্তে ব্যবহার শুরু হয় সিএস গ্যাস বা টিয়ার গ্যাস।

জর্জিয়ার সরকার অবশ্য এ অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, বিক্ষোভকারীদের ‘অবৈধ ও সহিংস কর্মকাণ্ড’ ঠেকাতে পুলিশ আইনসম্মতভাবে ব্যবস্থা নিয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর ইইউ সদস্যপদ প্রক্রিয়া স্থগিত করার প্রতিবাদে তিবিলিসে শুরু হয় বিক্ষোভ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান, সিএস গ্যাস ও পেপার স্প্রে ব্যবহার করে পুলিশ।

তবে বিক্ষোভে অংশ নেয়া ডা. কনস্তান্তিন চাকুনাশভিলি বলেন, তার গায়ে জলকামানের পানি লাগার পর কয়েকদিন ধরে তীব্র জ্বালা করছিল, যা ধুলেও কমেনি। বরং আরো বেড়েছে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে পরে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় আক্রান্তদের নিয়ে একটি জরিপ চালান। এতে ৩৫০ জন সাড়া দেন। তাদের প্রায় অর্ধেক জানান, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বমির মতো এক বা একাধিক উপসর্গ ৩০ দিনের বেশি স্থায়ী হয়েছিল। এদের মধ্যে ৬৯ জনকে পরীক্ষা করে দেখা যায় তাদের হৃদযন্ত্রের ইসিজিতেও অস্বাভাবিকতা রয়েছে। পরবর্তীতে তার এ গবেষণা আন্তর্জাতিক সাময়িকী টক্সিকোলজি রিপোর্টসে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে।

df8934e0-cb87-11f0-9fb5-5f3a3703a365.jpg

ডা. কনস্তান্তিন চাকুনাশভিলি

জলকামানে ব্যবহৃত ক্যামাইট শনাক্তে সহায়তা করেছে জর্জিয়ার দাঙ্গা-বিরোধী বাহিনী বা স্পেশাল টাস্কস ডিপার্টমেন্টোর কয়েকজন সদস্য। বিভাগটির সাবেক কর্মকর্তা লাশা শেরগেলাশভিলি জানান, ২০০৯ সালে জলকামানে ব্যবহারের জন্য এক রাসায়নিক পরীক্ষা করতে দেয়া হয় তাকে। সেটি এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি ও সহকর্মীরা শ্বাস নিতে পারছিলেন না। পানি বা বেকিং সোডা দিয়ে ধুলেও জ্বালা কমছিল না।

তিনি এর ব্যবহার বন্ধ করার সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু রাসায়নিকটি তবুও জলকামানে ভরা হচ্ছিল এবং ২০২২ পর্যন্ত তা চলেছে বলে জানান তিনি। তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের বিক্ষোভের ভিডিও দেখে তিনি বুঝতে পেরেছেন ঠিক একই রাসায়নিক আবার ব্যবহার করা হয়েছে।

২০১৯ সালের স্পেশাল টাস্কস ডিপার্টমেন্টের একটি তালিকা পেয়েছে বিবিসি। যেখানে দুটি অজ্ঞাত রাসায়নিকের উল্লেখ ছিল। আর সেগুলো হলো ‘কেমিক্যাল লিকুইড ইউএন১৭১০’ ও ‘কেমিক্যাল পাউডার ইউএন৩৪৩৯’। এ রাসায়নিক উপাদানগুলো কীভাবে মেশাতে হবে তাও সেখানে লেখা ছিল।

‘কেমিক্যাল পাউডার ইউএন৩৪৩৯’-এর সম্ভাব্য রাসায়নিক মিলিয়ে দেখা হয়। এর মধ্যে একমাত্র যেটি বিক্ষোভ দমনে ঐতিহাসিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি হলো ব্রোমোবেঞ্জিল সায়ানাইড, অর্থাৎ ক্যামাইট।

সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিশ্বখ্যাত টক্সিকোলজিস্ট প্রফেসর ক্রিস্টোফার হলস্টেগে জানিয়েছেন, ক্যামাইট ব্যবহারের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।

আন্তর্জাতিক আইনে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি প্রভাব আছে এমন রাসায়নিক ব্যবহার করার অবশ্য অনুমতি আছে। তবে তার ব্যবহার আনুপাতিক হতে হবে। কিন্তু অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ বিভাগে নিরাপদ ও প্রচলিত উপায় থাকা সত্ত্বেও একটি পুরনো, বেশি শক্তিশালী ও নিষিদ্ধ যৌগ ব্যবহার করা হলে তা রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

6d293540-cbbd-11f0-9fb5-5f3a3703a365.jpg

এই অনুসন্ধানের ফল উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক অ্যালিস এডওয়ার্ডস। তিনি এর আগেও বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে জর্জিয়া সরকারকে লিখেছেন।

তবে বিবিসির এ অনুসন্ধানকে ‘হাস্যকর’ ও ‘অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে জর্জিয়া সরকার। তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে’ থেকে ‘বর্বর অপরাধীদের বেআইনি কর্মকাণ্ডের’ জবাব দিয়েছে।

তবে এতকিছুর পরও জর্জিয়ার সরকার বিরোধী আন্দোলন একেবারে থেমে যায়নি। কঠোর আইন, বাড়তি জরিমানা ও কারাদণ্ডের কারণে রুস্তাভেলি অ্যাভিনিউতে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কমেছে, কিন্তু বিক্ষোভ থামেনি। ভোট কারচুপি, রাশিয়ার স্বার্থে কাজ করা ও নাগরিক সমাজের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে সরকারের পদত্যাগ দাবি করে এখনো প্রতি রাতেই মানুষ জড়ো হয়।