ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে একটি চূড়ান্ত চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে তারা। তবে কৌশলগত এ জলপথ পুনরায় খুলে দেয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিপূরণ, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং সামরিক হুমকি বন্ধ করা। খবর রয়টার্স।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি গতকাল বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।

একই সঙ্গে শনিবার দেয়া বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, তেহরানের কিছু দাবি যুক্তরাষ্ট্র পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হবে না।

ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি আরাঘচিকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র শর্তগুলো পূরণ করার পর হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া হলে কোন নৌপথগুলো ব্যবহার করা হবে, তা ওমানের সঙ্গে চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না। আরাঘচি বলেন, জুনে সই হওয়া একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি ওয়াশিংটন লঙ্ঘন করায় তেহরান এখন সরাসরি আলোচনায় বসবে না। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘তাদের সঙ্গে শুধু আংশিকভাবে আলোচনা করছি আমরা। আমরা শুধু ইরানের পরিস্থিতি দেখছি—তাদের মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি এবং তাদের হাতে কোনো অর্থ নেই।’

ক্ষতিপূরণসহ যেসব শর্ত ইরানের

আরাঘচি বলেন, ইরানের ওপর চালানো ব্যাপক হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ওপরও নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি।

ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সেক্রেটারি মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর আরো কয়েকটি শর্তের কথা জানিয়েছেন। এগুলো হলো— ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক হুমকি বন্ধ, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ, উপসাগর থেকে তুলে নিতে হবে মার্কিন নৌ অবরোধ, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদে ছাড়।

পাঁচ মাসেরও বেশি সময় আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। ট্রাম্পের দাবি, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে এবং আঞ্চলিকভাবে হুমকি তৈরির সক্ষমতা কমে যায়, সে লক্ষ্যেই এসব হামলা চালানো হয়েছিল।

জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরে ইরানের জাহাজ চলাচলের ওপর ফের অবরোধ আরোপ করে। তেহরানের দাবি, এ পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। অবশ্য এরই মধ্যে ওই যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরান চুক্তিতে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে কিনা, তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপও সমন্বয় করা হবে।

মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তিটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। রয়টার্সের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে উপসাগরে প্রবেশের জন্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করবে, সেগুলোর গতিবিধির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা রয়েছে। তবে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে, এমন ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর করা সহজ হবে না।

এদিকে গত শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে ইরান তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। এর আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এমন কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করেছিল বলে তারা দাবি করে।

হুথিদের হামলাও বেড়েছে

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের হামলার পাশাপাশি ইয়েমেনভিত্তিক তাদের মিত্র হুথিদের হামলাও বেড়েছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যবর্তী আরেকটি গুরুত্বপূর্ জ্বালানি তেল পরিবহনপথে হুথিরা জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।

গত মাসে ইয়েমেনে তাদের ওপর সৌদি আরব অবরোধ আরোপ করেছে—এমন অভিযোগ তুলে হুথিরা লোহিত সাগরে দেশটির বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। তবে রিয়াদ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে।

গতকাল হুথিরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরামকোর জাজান পরিশোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, পরিশোধনাগারে আগুন লেগেছিল এবং পরে তা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এতে কেউ আহত হয়নি। তবে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে মন্ত্রণালয় কিছু জানায়নি।