মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কোনো দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরুর আগে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বা ‘ডিক্লারেশন অব ওয়ার’ নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ অবধি কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রেই এ নিয়ম আর মানা হচ্ছে না। বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যে ব্যাপক সামরিক অভিযান চলছে, তাকে সংঘাত বা মিশন বলা হলেও কৌশলগত কারণে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে না ট্রাম্প প্রশাসন।

‘ইরান মিশন’ প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্ত

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত মাত্র ১১ বার আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ১৯১৭ সালে উড্রো উইলসন ও ১৯৪১ সালে পার্ল হারবার আক্রমণের পর ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে এসে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেই ঐতিহ্যের বিলোপ ঘটেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৭৩ সালের একটি আইনের দোহাই দিয়ে মাত্র দুই পৃষ্ঠার একটি নথির মাধ্যমে কংগ্রেসকে ইরানের সামরিক অভিযানের কথা জানিয়েছেন। এতে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়াই আক্রমণকে ‘সম্মিলিত আত্মরক্ষা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা জাতিসংঘের সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের একটি বিশেষ সুযোগ।

মার্কিন কংগ্রেস

মার্কিন কংগ্রেসে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

নামের মারপ্যাঁচে ‘ওয়ার’ বনাম ‘কনফ্লিক্ট’

ট্রাম্প প্রশাসন পেন্টাগনের নাম পরিবর্তন করে ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ করার প্রস্তাব দিলেও ইরানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করতে তারা নারাজ। গত সপ্তাহে দেশটির ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেয়া স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণেও ট্রাম্প ইরান প্রসঙ্গ প্রায় এড়িয়ে গেছেন। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাও বিষয়টিকে যুদ্ধ বলতে অস্বীকার করছেন। হাউস স্পিকার মাইক জনসন একে চার দিনের একটি ‘সুনির্দিষ্ট মিশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সেনেটর টমি টিউবারভিল একে প্রথমে যুদ্ধ বললেও পরে ‘স্বল্পমেয়াদী সংঘাত’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাদের মতে, এটি কেবল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।

কংগ্রেসের ক্ষমতা হরণ ও ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ পাস করে প্রেসিডেন্টের একক যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা সংকুচিত করতে চেয়েছিল মার্কিন কংগ্রেস। এ আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি সেনা মোতায়েন রাখতে পারেন না। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের অপারেশন পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে, যা এ সময়সীমার ভেতরেই পড়ে। তবে লজিস্টিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অনুমোদনহীন সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান।

পার্টিজান রাজনীতি ও দ্বিমত

ট্রাম্পের সামরিক ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যে সিনেটে একটি দ্বিপক্ষীয় রেজোলিউশন তোলার চেষ্টা করছেন রিপাবলিকান সেনেটর র‍্যান্ড পল এবং ডেমোক্র্যাট সেনেটর টিম কেইন। তাদের মতে, সংঘাত যদি করতেই হয় তবে কংগ্রেসের সদস্যদের প্রকাশ্য ভোট ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত। টিম কেইন সতর্ক করে বলেন, ডেস্কের নিচে লুকিয়ে না থেকে সরাসরি ভোট দিন। নতুবা ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টরা যেকোনো সময় ইচ্ছামতো যুদ্ধ শুরুর সুযোগ পাবেন।

অতীতের ধারাবাহিকতা

অতীতে কোরিয়া যুদ্ধকে ‘আন্তর্জাতিক পুলিশ অ্যাকশন’ বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। ভিয়েতনাম যুদ্ধের জন্য ‘গালফ অব টকিন’ রেজোলিউশন ব্যবহার করেছিলেন লিন্ডন বি জনসন। এমনকি ৯/১১ পরবর্তী সময়ে ‘ওয়ার অন টেরর’ এর নামে প্রেসিডেন্টরা ব্যাপক ক্ষমতা ভোগ করছেন। ওবামা প্রশাসন যখন সিরিয়ায় আইএস-এর ওপর বোমা হামলা করছিল, তখনো রিপাবলিকানরা কমান্ডারের ক্ষমতা হ্রাসের ভয়ে নতুন কোনো যুদ্ধ অনুমোদনের বিরোধিতা করেছিল। আজ সেই একই পথ অনুসরণ করে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের তোয়াক্কা না করেই ইরানের ওপর আঘাত চালিয়ে যাচ্ছে।