হরমুজ প্রণালির কাছে গতকাল ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবিয়ে দেয়। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ শুরুর পর জাহাজ চলাচলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এটাই সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা। খবর রয়টার্স।

হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায়। বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের ফিউচার দর ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত জুলাইয়ের পর প্রথমবার। এ ঘটনায় অন্তত একজন নাবিক নিহত এবং আরেকজন নিখোঁজ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

গত এক মাসে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর এসব হামলার ঘটনা ঘটল। ওই সময়ে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছিল ওয়াশিংটন।

ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। জর্ডান বলেছে, তারা ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে, তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, ভবিষ্যতে হামলা হলে জবাবের মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়বে। একইসঙ্গে জানিয়েছে, সমুদ্রে নতুন ও আরো বিস্তৃত নিষিদ্ধ এলাকার মানচিত্র শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। ওই এলাকা পাকিস্তানের কাছাকাছি উপকূলের চাবাহার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তেহরান নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসে তার রিপাবলিকান পার্টি নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কিনা, তা নির্ধারিত হবে।

সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। কারণ তারা আর বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে না। তারা মরিয়া হয়ে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে।’

পরে গতকাল ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ হোয়াইট হাউজের শীর্ষ উপদেষ্টারা ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন যে সংঘাত তার প্রেসিডেন্টের মেয়াদের বাকি সময়, অর্থাৎ ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্তও চলতে পারে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যেও লড়াই বেড়েছে। এটিও যুদ্ধের দ্বিতীয় একটি ফ্রন্ট, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে।

আগুনে জ্বলছে ইরানি ট্যাংকার

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রাতভর তারা পাঁচটি ইরানি জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ধ্বংস করেছে। জাহাজগুলো ডুবে যাওয়ার আগে আগুনে জ্বলতে থাকা অবস্থার ভিডিওও প্রকাশ করেছে তারা। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একটি মার্কিন নৌযানে দুইবার হামলা চালানোর জবাব হিসেবে এসব হামলা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এতে কোনো মার্কিন নাগরিক আহত হননি।

কলম্বিয়া সফরের সময় সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানে হামলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর তারা যতবার এমন করবে বা করার চেষ্টা করবে, ততবার তাদের ট্যাংকার হারাতে হবে।’

ইরান জানিয়েছে, তারা এর জবাবে দুটি মার্কিন জাহাজ ও আটটি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে।

দুবাইয়ের উপকূলে নোঙর করে থাকা তেলজাত পণ্যবাহী ট্যাংকার হারকিউলিস স্টারে একজন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে জাহাজটির চার্টারার পেনিনসুলা।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওই এলাকার একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র বা কোনো ধরনের প্রজেক্টাইলের আঘাতের পর সেটি একদিকে কাত হয়ে পড়েছে। এটি একই জাহাজ কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

ইরাকের দুই বন্দর কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বহনকারী নিউ অ্যান্ড্রোস নামের একটি ট্যাংকার ইরাকের জলসীমায় ড্রোনের আঘাতে আগুন ধরে যায়। জাহাজটির ২২ জন ক্রুর মধ্যে কেউ হতাহত হয়েছেন—এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির উত্তর দিকের উপসাগর ও ওমান উপসাগরের দুই পাশেই বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে অচল করে দেয়ার মতো আগুন বা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) খোর ফাক্কান বন্দরে একটি এলএনজি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বুধবার রাতে ইরানের বন্দরনগরী জাস্কের দক্ষিণ অংশে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি। সমুদ্র থেকে বিস্ফোরণের শব্দটি এসেছে বলে জানানো হলেও এর উৎস বা কারণ সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত

ওয়াশিংটন সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় দাবি করছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল করানোর ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য বাড়ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে চলতি মাসে আবারো লড়াই শুরু হওয়ায় প্রণালিটি ধীরে ধীরে খুলে দেয়ার সেই প্রক্রিয়া বড় ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গ্যালিমবার্তি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। ৩০ আগস্ট লড়াই ফের শুরুর আগের সপ্তাহে এই প্রবাহ দৈনিক ৮০-৯০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত উঠেছিল।

তবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চেয়েও বেশি বেড়েছে পরিশোধিত জ্বালানির দাম। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য গ্যালনপ্রতি ৫ ডলার ৯৪ সেন্টের ওপরে উঠে নতুন সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে।