গাজা থেকে উঠে আসা কঙ্কালসার শিশুদের ছবি কিছুটা হলেও নাড়া দিয়েছে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সমর্থক মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের। ইসরায়েলের তৈরি দুর্ভিক্ষে বিধ্বস্ত গাজায় মানবিক বিপর্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য সরাসরি ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছেন। তারা সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত জিএইচএফ কর্তৃক খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার, যেখানে খাবারের খোঁজে আসা ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে, অনেক কংগ্রেস সদস্য আবার সাধারণ বিবৃতি দিয়ে শুধু সাহায্য প্রবেশের কথা বলছেন, ইসরায়েলের নীতির সমালোচনা করছেন না।
প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বলেন, ‘এটাই বাস্তবতা। এরইমধ্যেই ২ লাখ ফিলিস্তিনি হতাহত হয়েছে। যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এখনো চরমপন্থী ইসরায়েলি সরকার গণদুর্ভিক্ষের মাধ্যমে গাজায় জাতিগত নির্মূল কার্যক্রম চালাচ্ছে।‘
যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে ইসরায়েলের প্রতি দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সমর্থন এখন চাপের মুখে পড়ছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো প্রকৃত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ অবস্থায়ও, মাত্র কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহায়তা ইসরায়েলকে দেয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে।
শনিবার, ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন তীব্র ভাষায় নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দোষারোপ করে বলেন, তারা গাজায় আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর জায়গায় ‘ভাড়াটে বাহিনী’ পাঠাচ্ছেন, যার ফলে আরো মৃত্যু ও ধ্বংস ঘটছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন গাজায় চলমান ভয়াবহতা নতুন মাত্রা পাচ্ছে।‘
জিএইচএফ পরিচালিত খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রগুলোকে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘মৃত্যুকূপ’ ও ‘মানব হত্যাকেন্দ্র’ বলে অভিহিত করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন উল্টো হামাসকে এর জন্য দায়ী করছে। তবে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো হামাসের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কংগ্রেসম্যান জন গারামেন্ডি বলেন, ‘ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃতভাবে মানবিক সাহায্য ঠেকানো জাতিসংঘের সংজ্ঞায় গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে।‘ তিনি আরো বলেন, ‘ইসরায়েলের সাহায্য দেয়ার সামর্থ্য আছে, আর আন্তর্জাতিক আইনে তা তাদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তেই গাজাবাসীরা অনাহারে মরছে।‘
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলে যাচ্ছেন, তারা গাজা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে বের করে দিতে চায়। ইসরায়েলি হেরিটেজ মন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু বলেন, ‘কোনো দেশ তার শত্রুদের খাওয়ায় না। সরকার গাজাকে নিশ্চিহ্ন করার দিকে এগোচ্ছে।‘
গাজা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, অন্তত ১২৭ জন ফিলিস্তিনি অপুষ্টিতে মারা গেছেন, এর মধ্যে গত শনিবারেই পাঁচজন।
ইসরায়েলপন্থী লবির সহায়তায় কোরি বুশকে হারানো ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ওয়েসলি বেল বলেন, ‘ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও আত্মরক্ষার অধিকার আমি সবসময়ই সমর্থন করেছি। কিন্তু শিশুদের অনাহারে মরতে দেয়া এবং খাদ্যের জন্য অপেক্ষমাণ সাধারণ মানুষকে গুলি করা আত্মরক্ষা নয়। এটি থামাতে হবে।‘
কংগ্রেসওমেন সামার লি বলেন, ‘মানুষ রাস্তায় লুটিয়ে পড়ছে ক্ষুধায়। একের পর এক ভয়াবহতা। যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের এ পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যায় অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।‘
তবে অনেক মার্কিন রাজনীতিক সরাসরি ইসরায়েলকে দায় না দিয়ে শুধু মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। কেউ কেউ হামাসকে দায়ী করেও বক্তব্য দিয়েছেন। কংগ্রেসওমেন গ্রেস মেং বলেন, ‘একজন মা হিসেবে গাজায় শিশুদের না খেতে পেয়ে মরতে দেখা হৃদয়বিদারক।‘ কিন্তু এরপরেই তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল ১৮ লাখ টনেরও বেশি খাদ্য প্রবেশ করিয়েছে, অথচ হামাস এখনো জিম্মি ধরে রেখেছে, সাহায্যের অপব্যবহার করছে এবং যুদ্ধ লম্বা করতে অস্ত্র গুটাতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।‘
ডেমোক্র্যাটদের কেউ কেউ গাজার দুর্ভিক্ষকে ট্রাম্পের ব্যর্থতার ফল হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু নীরব থেকেছেন ইসরায়েল প্রসঙ্গে। হাউসের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস বলেন, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল চলতে পারে না। ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত এই মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করা।‘
কংগ্রেসম্যান টিম কেনেডিও বলেন, ‘ট্রাম্পের কৌশলগত ও নৈতিক ব্যর্থতার কারণে আজ গাজার পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।‘
রিপাবলিকান পার্টির বেশিরভাগ সদস্য গাজার দুর্ভিক্ষ বিষয়ে নীরব থাকলেও, ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন বলেন, ‘জিম্মিদের ছেড়ে দাও। না হলে, ক্ষুধার্ত থাকো।‘ এ কথা কার্যত ইসরায়েলের নীতির প্রতি সমর্থন।















