গত বছর যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ডানপন্থী থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ‘প্রজেক্ট এস্থার’ নামে একটি নীতিনির্ধারণী রূপরেখা প্রকাশ করেছিল, তখন তেমন নজর কাড়েনি। কিন্তু আট মাস পর, ইসরায়েলের গাজা অভিযানে মার্কিন সমর্থনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ-আন্দোলনের মধ্যে এই দলিলটি আবার আলোচনায় এসেছে। কারণ অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নে সরাসরি অগ্রসর হচ্ছে। খবর আল জাজিরা।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন বলছে, এটি মূলত ইহুদি বিদ্বেষীদের মোকাবেলার নীতি। তবে সমালোচকরা একে দেখছেন ইসরায়েলবিরোধী বা ফিলিস্তিনপন্থী যেকোনো কণ্ঠস্বরকে ‘হামাসের সহযোগী’ হিসেবে দাগিয়ে তোলার কৌশল হিসেবে।
প্রজেক্ট এস্থার কী
প্রজেক্ট এস্থার হচ্ছে একটি ২৪ মাসব্যাপী কৌশলগত পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের ভিত্তি বলে বিবেচিত সংগঠনগুলোকে আইনি, রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত করে ফেলা। দলিলটিতে বলা হয়েছে, তারা ‘হামাস সাপোর্ট নেটওয়ার্ক’ নামের একটি কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে চায়—যেখানে তারা বহু নাগরিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এমনকি প্রগতিশীল ইহুদি গোষ্ঠীকেও জড়িয়েছে।
হেরিটেজ ফাউন্ডেশন কারা
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক এই থিঙ্কট্যাংকটি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতিতে প্রভাবশালী। এদের অন্যতম লক্ষ্য ‘মুক্ত বাজার’, ‘সীমিত সরকার’ ও ‘যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে’ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সমালোচকদের মতে, প্রজেক্ট এস্থারের মাধ্যমে তারা মার্কিন সংবিধানসম্মত বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব করছে। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভিক্টোরিয়া কোয়েটস। তিনি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন।
প্রজেক্ট এস্থারের লক্ষ্য কী
এটি ১৯টি ‘কাঙ্ক্ষিত ফলাফল’কে তালিকাভুক্ত করেছে। তার মধ্যে রয়েছে— মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থী বিদেশী শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি, সামাজিক মাধ্যমে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ সামগ্রী সেন্সর করা, ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের অনুমতিপত্র না দেয়া, আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কার্যকলাপের অভিযোগ এনে সরকারি দপ্তরগুলোর সহায়তা চাওয়া এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিরোধীদের হয়রানি করা ইত্যাদি।
তথাকথিত ‘হামাস সাপোর্ট নেটওয়ার্ক’ কী
প্রজেক্ট এস্থার দাবি করছে, হামাস সাপোর্ট নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি ছায়াগোষ্ঠী, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হামাসকে সহযোগিতা করছে। এই নেটওয়ার্কে তারা মুসলিম, আরব ও প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠন, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গোষ্ঠীকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে বাস্তবে এরকম কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনকে উপকরণগত সহায়তা প্রদান’ আইনের আওতায় কঠোর শাস্তি রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে এই অভিযোগগুলোর উদ্দেশ্য হলো জনমনে ভীতি সৃষ্টি করে ফিলিস্তিন সংহতির বার্তা রুদ্ধ করা।
কোন সংগঠনগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে
এই প্রকল্পে কয়েকটি সংগঠনকে সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন— আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন (এএমপি), জুয়িশ ভয়েস ফর পিস (জেভিপি), স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন (এসজেপি)। এর মধ্যে এএমপির নির্বাহী পরিচালক ওসামা আবুইরশেইদ বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের নামেই মুসলিম শব্দটি থাকায় তারা আমাদের সহজ টার্গেট মনে করছে। এটি ইসলামবিদ্বেষেরই প্রতিফলন।‘
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন টার্গেটে
যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫০-এর কম বয়সী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৭১% মানুষ ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তাই এই পরিবর্তন ঠেকাতে কলেজ ক্যাম্পাসগুলোকে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রজেক্ট এস্থার। যেমন— কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে মিডল ইস্ট স্টাডিজ বিভাগকে পর্যালোচনায় আনা হয়েছে। একইভাবে ক্যানারি মিশন নামক একটি বিতর্কিত ওয়েবসাইটের তথ্য ব্যবহার করে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হচ্ছে।
প্রজেক্ট এস্থার কতটুকু কার্যকর হচ্ছে
অনেকটাই। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন বিভাগ এরইমধ্যে ইসরায়েলবিরোধী বিদেশী শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিল করেছে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। ফলে বহু শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তবে এসব দমন নীতি উল্টো জনসচেতনতা বাড়িয়ে দিয়েছে। জেভিপির রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেন, ‘এই বর্বর হুমকিই অনেককে আরো দৃঢ়ভাবে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করছে।‘















