ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা। দেশটির জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। নেই পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল ও বিদেশী পর্যটক। এতে করে টান পড়েছে নগদ অর্থের মজুতেও। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময় পার করছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিক ও ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
কিউবার এই বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু কঠোর পদক্ষেপ। গত জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যেখানে বলা হয়েছে—যেসব দেশ কিউবাকে তেল সরবরাহ করবে, তাদের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা হবে। এই হুমকির মুখে মেক্সিকোর মতো বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোও কিউবায় তেলবাহী জাহাজ পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। এর আগে ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন সামরিক চাপের কারণে সেখান থেকেও তেল আসা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাউম ৮০০ টন ত্রাণ পাঠিয়েছেন এবং মানবিক বিপর্যয়ের সতর্কতা দিয়েছেন।

জ্বালানির অভাবে রাস্তায় গাড়ি ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে কিউবাতে।
দেশটির রাজধানী হাভানার চিত্র এখন অন্যরকম। রাস্তায় বাস বা ট্যাক্সি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সরকার বাধ্য হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি দফতরগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। শহরগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। রান্নার গ্যাস বা কেরোসিন না থাকায় সাধারণ মানুষ এখন কাঠ ও কয়লার চুলায় রান্না করছে। স্থানীয় বাজারে কয়লার চুলার চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে হোস্টেল ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে বলা হয়েছে, যদিও গ্রামাঞ্চলেও বিদ্যুতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
কিউবার আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো পর্যটন খাত। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে এই খাতটিও এখন ধ্বংসের মুখে। কানাডা ও রাশিয়ার বড় বড় এয়ারলাইন্সগুলো চলতি সপ্তাহে কিউবায় তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। বিমানে দেয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হাজার হাজার পর্যটককে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বিশেষ খালি বিমান পাঠাচ্ছে দেশগুলো। এমনকি যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য কিউবা ভ্রমণে সতর্কতা জারি করেছে। যেখানে ২০২৫ সালে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার কানাডিয়ান কিউবায় ভ্রমণ করেছিলেন, সেখানে পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ায় হাভানার বিখ্যাত হোটেল ও বারগুলো এখন জনমানবহীন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

হাভানায় পর্যটকদের কাছে হাতে তৈরি ব্যাগ বিক্রি করছেন এক ব্যক্তি
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, গত বছরের ঘূর্ণিঝড় মেলিসার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তারা কাজ করছিল, কিন্তু এখন জ্বালানি সংকটের কারণে ত্রাণ পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। শহরাঞ্চলে টাটকা শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেক কূটনীতিক মনে করছেন, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের খাদ্য সংকট শুরু হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা চলছে, যুক্তরাষ্ট্র আসলে কিউবাকে ‘ভাতে মারার’ নীতি গ্রহণ করেছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো চরম সংকটে পড়ে মানুষ যখন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করবে, তখন সরকার পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে এ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বলি হচ্ছে সাধারণ কিউবান নাগরিকরা। তারা এখন ১৯৬২ সালের ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময়ের মতো এক অজানা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে কিউবার এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয় সেদিকে।










