অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠছে সমুদ্রের পানি। যার প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই আটকে থাকবে না। এ উষ্ণতার ধাক্কায় পৃথিবীর এক প্রান্তে বন্যা, অন্য প্রান্তে খরা, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও ফসলহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ প্রশান্ত মহাসাগরে এবার তৈরি হচ্ছে শক্তিশালী এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে এটি সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইমেট ল্যাবের মতে এতে এলনিনোর সৃষ্ট প্রভাবে সাড়ে চার লাখ মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা যায়। স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস উষ্ণ সমুদ্রের পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে রাখে। কিন্তু এই বাতাস দুর্বল হয়ে গেলে উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম হয়ে ওঠে। এ অবস্থানকেই এল নিনো বলে অভিহিত করা হয়। এই পরিবর্তন পরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টি ও তাপমাত্রার ধরনেও প্রভাব ফেলে।

তবে এবারের এল নিনোকে আলাদা করে দেখার কারণ এর তীব্রতা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ দশমিক ০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এর আগে আর কোনো এল নিনোর সময় তাপমাত্রার এমন উল্লম্ফন দেখা যায়নি।

সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হলে সেটিকেই এলনিনো ধরা হয়। তাপমাত্রা ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি বাড়লে সেটিকে দুর্বল, ১ ডিগ্রি হলে মাঝারি, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি হলে শক্তিশালী এবং ২ ডিগ্রি হলে খুব শক্তিশালী এল নিনো বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওই সংস্থাটি জুনেই এল নিনো শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা অবশ্য ‘সুপার এল নিনো’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করে না। তবে চলতি মাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, এবারের এল নিনো খুব শক্তিশালী পর্যায়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

এর আগে, ২০২৩-২৪ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে ২০২৪ সালকে রেকর্ডকালের সবচেয়ে উষ্ণ বছর করে তুলেছিল। ওই সময় বলিভিয়া ও ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ দাবানল হয়। নেপাল, সুদান ও স্পেনে দেখা দেয় প্রবল বন্যা। মেক্সিকো ও সৌদি আরবে তীব্র তাপপ্রবাহে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়।

এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হয় না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এর প্রভাব আরো তীব্র করে তুলতে পারে। শিল্প ও কৃষিসহ মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ফলে এল নিনোর সময় তাপমাত্রা আরো বেড়ে যেতে পারে। খরা ও বৃষ্টি হতে পারে আরো তীব্র রকমের। সঙ্গে বাড়তে পারে দাবানল, বন্যা ও ফসলহানির মতো দুর্যোগও।

এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য মানবিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইমেট ল্যাবের হিসাবে, এবারের এল নিনোর কারণে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এর মধ্যে নাইজেরিয়ায় ৩১ হাজার ৪০০, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০ এবং সুদানে ১৭ হাজার ৬০০ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। তবে আগাম সতর্কতা, তাপপ্রবাহ মোকাবেলার ব্যবস্থা এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করেন গবেষকরা।

বৃষ্টির ক্ষেত্রেও দেখা যেতে পারে বিপরীত চিত্র। দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্য এশিয়ার কিছু এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের রিও গ্রান্দে দো সুলে বন্যায় ১৮০ জনের বেশি মানুষ মারা যান এবং ৬ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অংশে খরা দেখা দিতে পারে। এতে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর প্রভাব খাদ্যের বাজারেও পড়তে পারে। বিশ্বের শীর্ষ চাল উৎপাদক ভারত চলতি মৌসুমে ২০০৯-১০ সালের পর সবচেয়ে বড় উৎপাদন হ্রাসের মুখে পড়তে পারে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এল নিনোর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনোর প্রভাব আবার প্রশান্ত মহাসাগরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের মতো অনেক দূরের অঞ্চলেও এটি তাপপ্রবাহকে আরো তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তৎপরতা বাড়তে পারে।

—রয়টার্স থেকে অনূদিত