অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলে মাসাফের ইয়াত্তার বাসিন্দা আওদাহ হাতালিন। ঘটনাটি গত বছরের ২৮ জুলাইয়ের। এদিন উম্ম আল-খাইর গ্রামে এক সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী হামলা চালায়। মোবাইল ফোনে সেই ঘটনা ধারণ করতে শুরু করেন ৩১ বছর বয়সী আওদাহ। বুঝতেই পারেননি যে তিনি নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোই ক্যামেরাবন্দী করছেন। এর আগে অস্কারজয়ী প্রামাণ্যচিত্র ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর নির্মাণকাজেও সহায়তা করেছিলেন এ ফিলিস্তিনি।
এ ঘটনা নিয়ে কাজ করেছে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা আল-হক। তারা ঘটনাস্থলের কয়েক ডজন ভিডিও ও ছবি পর্যালোচনা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ মিলিয়ে দেখে। একই সঙ্গে ভৌগলিক অবস্থান ও ওপেন সোর্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুরো ঘটনার পুনর্গঠন করে।
হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্তিতে প্রকাশিত ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আওদাহকে হত্যা করা গুলিটি ছোড়েন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ইনোন লেভি। কিন্তু তিনি এখনো বিচারের মুখোমুখি হননি।
ইসরায়েলি আদালতে লেভি দাবি করেন, তার গুলির সঙ্গে আওদাহর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আল-হক ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে লেভির বহন করা আগ্নেয়াস্ত্রের মিল খুঁজে পেয়েছে। সেখানে দেখা যায়, একটি বুলেটের আঘাতেই বুক থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আওদাহর মৃত্যু হয়। তার বুকে থাকা এক সেন্টিমিটার (দশমিক ৪ ইঞ্চি) আকারের ক্ষতচিহ্নটি লেভির ব্যবহৃত ৯ মিলিমিটার পিস্তলের গুলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অস্ত্রটি ইসরায়েলে তৈরি— যা বসতি স্থাপনকারীরা প্রায়ই ব্যবহার করেন।
আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন লেভি। কিন্তু আল-হক বলছে, তার ওপর কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কোনো ফিলিস্তিনির কাছেই অস্ত্র ছিল না এবং গুলি ছোড়ার সময় আওদাহও হুমকি ছিলেন না।
হামলার দিন লেভি অন্য কয়েকজন ইসরায়েলির সঙ্গে খননযন্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তারা একটি নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে জমি তৈরির কাজ শুরু করেন। এক সময় নির্ধারিত ভূমি থেকে সরে তারা উম্ম আল-খাইরের বাসিন্দাদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে প্রবেশ করেন।
এর কিছুক্ষণ আগেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কারণ আরেক বসতি স্থাপনকারী রনি আভরাহাম পরিচালিত একটি খননযন্ত্রের হাইড্রোলিক হাতুড়ির আঘাতে আওদাহর চাচাতো ভাই আহমাদ হাতালিন মাথায় গুরুতর আঘাত পান।
তদন্তকারীদের কাছে সাক্ষীরা জানান, পরে লেভি নিজেও কয়েকজন গ্রামবাসীকে মারধর করেন। আহতদের মধ্যে দুজন নারীও ছিলেন। এর পরই তিনি অস্ত্র তাক করে গুলি চালান।
ঘটনাস্থলেই লেভিকে গ্রেফতার করা হয়নি। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন। আর ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক কর্মীদের দেখিয়ে দিচ্ছেন। পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তাকে আটক করা হলেও ইসরায়েলি আদালত তিন দিনের গৃহবন্দি থাকার শর্তে মুক্তি দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর ‘কার্যকর সমন্বয়’-এর ইঙ্গিত দেয় ঘটনাটি। কারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দেয়া হয়েছে এবং তাদের অপরাধের সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করে আইন প্রয়োগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
আওদাহকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য ছুটে আসা অ্যাম্বুলেন্সের পথও আটকে দেয় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। এসময় ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেননি।
হত্যার পর আওদাহর মরদেহ ১০ দিন ধরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। মরদেহ ফেরত দেয়ার দাবিতে গ্রামের নারীরা অনশন কর্মসূচি শুরু করেন।
তদন্তে বলা হয়েছে, গুলির ঘটনার আগে ও পরেও মাসাফের ইয়াত্তার বাসিন্দাদের নিয়মিত হয়রানি করতেন লেভি।
প্রতিবেদনে লেভিকে দক্ষিণ পশ্চিম তীরের ‘প্রভাবশালী বসতি স্থাপনকারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার কর্মকাণ্ড ওই অঞ্চলের ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তিনি মেইতারিম ফার্ম নামে একটি অবৈধ বসতি পরিচালনা করেন। এছাড়া হাশোমের ইয়োশ নামের একটি ইসরায়েলি সংগঠনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করেন, যারা অবৈধ বসতিগুলোয় কাজ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণে এটি একটি বৃহত্তর সংগঠিত ব্যবস্থার অংশ।
‘দ্য কিলিং অব আওদাহ হাতালিন: বিয়ন্ড আ সেটলার ক্রাইম’ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং সহিংস ও অপরাধমূলক ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের অংশ।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব হামলা এমন একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে, যার ফলে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন এবং পরে সেখানে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের কাছে এখন মোবাইল ফোনই হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। নিজেদের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনা নথিভুক্ত এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যান তারা। কিন্তু সেই ন্যায়বিচার এখনো অধরাই রয়ে গেছে।










