ইয়েমেনে সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। শনিবার হুথিদের ৩৬টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করে দেশ দুটি। লোহিত সাগরে একের পর এক জাহাজে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে হুথিদের স্থাপনা লক্ষ্য করে এ হামলা চালিয়েছে মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনী। খবর বিসিসি ও রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন বলেছেন, ‘এ সম্মিলিত হামলা হুথিদের জন্য পরিষ্কার বার্তা যে তারা যদি আন্তর্জাতিক জাহাজ ও নৌযানগুলোয় অবৈধ আক্রমণ বন্ধ না করে, তাহলে হামলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’
ইরাক ও সিরিয়ায় আমেরিকান হামলার একদিন পর ইয়েমেনে যৌথ এ বিমান হামলা চালায় মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনী। গত ২৮ জানুয়ারি জর্ডানে সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার ইরাক ও সিরিয়ায় এ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও এ অভিযানে সহায়তা প্রদানকারী অন্য দেশগুলো এক বিবৃতিতে বলেছে, হামলার উদ্দেশ্য ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং নিরপরাধ নাবিকদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলার জন্য হুথিদের ব্যবহৃত সক্ষমতাকে ব্যাহত ও অবনমিত করা।
শনিবারের এ হামলায় হুথিদের সু-সংরক্ষিত অস্ত্র স্টোরেজ অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেম এবং লঞ্চার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও রাডারগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ইয়েমেনের ১৩টি স্থানে ৩৬টি হুথি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘আমাদের লক্ষ্য উত্তেজনা কমানো এবং লোহিত সাগরে স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার। কিন্তু হুথি নেতৃত্বের প্রতি আমাদের হুঁশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করতে দিন। অব্যাহত হুমকির মুখে আমরা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জীবনের সুরক্ষা ও বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে দ্বিধা করব না।’
ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া বাহিনীগুলোর ওপর মার্কিন হামলা: শুক্রবার ইরাক ও সিরিয়ার ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ও বাহিনীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছে।
গত ২৮ জানুয়ারি জর্ডানে সিরিয়া সীমান্তে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর সিরিয়া ও ইরাকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া ঘাঁটিগুলোয় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বাইডেন প্রশাসন বলে আসছিল, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না যুক্তরাষ্ট্র। তবে হামলার জবাব দেয়া হবে। এর পরই শুক্রবার সিরিয়া ও ইরাকে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মধপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে ইরাক ও সিরিয়ায় হামলা চালালেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যাবে না বাইডেন প্রশাসন।
সিরিয়া ও ইরাকে হামলায় দূরপাল্লার বি-১ বোমারু বিমান ব্যবহার করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়িয়ে নেয়া হয়েছে। ইরাকে তিনটি ও সিরিয়ায় চারটি স্থানে এসব হামলা চালানো হয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, সামরিক রসদভাণ্ডার ও ড্রোন স্টোরেজ ইউনিট। হামলাকে ‘স্পষ্টতই সফল’ দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট স্টাফের পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডগলাস সিমস।
এদিকে নিজেদের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা চালানোকে ‘আমেরিকান আগ্রাসন’ বলেছে সিরিয়া। কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরাকের সামরিক বাহিনীও।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জর্ডানে হামলার পর থেকে পাল্টা হামলা চালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিলেন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সদস্যদের একটা অংশ। সে চাপের ফল এ হামলা।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনই সরাসরি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াচ্ছে না বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী মাইকেল প্যাট্রিক মুলরোয় বলেছেন, ‘এ হামলার ফলে আগামী দিনগুলোয় ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন স্থাপনায় হামলা থেকে নিবৃত্ত থাকবে। যদিও সেটা দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে হয় না। তবে এ হামলার চূড়ান্ত সাফল্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো গেছে।’
তিনি জানান, এ হামলা ও হামলার পর আরো আক্রমণ চালানোর ইঙ্গিতের ফলে ইরাক ও সিরিয়াস্থ মিলিশিয়া ঘাটিগুলো থেকে ইরানি বিপ্লবী বাহিনী তাদের সদস্যদের প্রত্যাহার করবে।
অ্যারাবিয়ান গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের ফেলো হুসেইন ইবিশের মতে, এটি দেরিতে জবাব (হামলা) দেয়া ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে না চাওয়ার ইঙ্গিত।
তবে এ হামলার পরও থামছে না বাইডেনের সমালোচনা। প্রভাবশালী রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান মাইক জনসনের মতে, ইরানের প্রতি বেশ ‘নমনীয়’ আচরণ দেখাচ্ছেন বাইডেন। অন্যদিকে সিনেটর টম কটন মার্কিন হামলাকে ‘রক্তস্বল্পতা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ ধরনের নমনীয় জবাব ইরানকে আরো উৎসাহিত করবে। আরো বিধ্বংসী হামলাই কেবল আয়াতুল্লাহদের ভয় দেখাতে পারে।’
তবে হুসেইন ইবিশ জানান, এ হামলার মাধ্যমে বাইডেন পরিষ্কার ইঙ্গিত দিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র সেনা ও স্বার্থ সুরক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া অব্যাহত রাখবে, যার মাধ্যমে তিনি মূলত তার ওপর তৈরি হওয়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলিয়েছেন।










