নারীর স্বাস্থ্য সমস্যাকে সময়মতো গুরুত্ব না দেয়া ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার প্রভাব শুধু শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কর্মজীবনে বাধা, আয় কমে যাওয়া, ক্যারিয়ারের সুযোগ হারানো এবং পরিবারের ওপর অতিরিক্ত চাপ। যুক্তরাষ্ট্রের এক জরিপে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী কর্মঘণ্টা কমাতে, দীর্ঘ সময় ছুটিতে থাকতে কিংবা ক্যারিয়ারের সুযোগ থেকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এসব আর্থিক সংকট দীর্ঘমেয়াদে নারীর জীবনে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নারীদের স্বাস্থ্য ও সুযোগ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান পিভটালের সঙ্গে গ্যালাপের করা জরিপে এ চিত্র উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জরিপে ৫১ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে অন্তত একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৯ শতাংশ। নারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বলেছেন, চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী তাদের উপসর্গ কিংবা ব্যথাকে গুরুত্ব দেননি। অনেকে ভুল রোগ নির্ণয় বা রোগ নির্ণয় না হওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য বা নির্দেশনা না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবায় এসব অভিজ্ঞতার প্রভাব পরবর্তীকালে দেখা গেছে কর্মক্ষেত্রে। জরিপে ৪০ শতাংশের বেশি নারী জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে তাদের স্বাস্থ্য কোনো না কোনোভাবে কর্মজীবন সীমিত করেছে। এর মধ্যে কাজের সময় কমানো, দীর্ঘ সময় বেতনহীন ছুটিতে থাকা, ক্যারিয়ারের সুযোগ হারানো কিংবা নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মজীবন থেকে সরে যাওয়ার মতো বিষয় রয়েছে।
প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে এ প্রভাব আরো বেশি। তাঁদের ৬৬ শতাংশ জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে কর্মজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অর্থাৎ চিকিৎসাসেবায় ঘাটতি যত বাড়ছে, তার প্রভাব তত বেশি ছড়িয়ে পড়ছে কর্মক্ষেত্রেও।
স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে নারীদের একটি অংশ শুধু সাময়িকভাবে কর্মঘণ্টা কমাচ্ছেন না, বরং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৫০ হাজার ডলারের কম আয় করা নারীদের ৩৫ শতাংশ জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যগত কারণে তাদের ক্যারিয়ারের সুযোগ কমেছে। ২৮ শতাংশ দীর্ঘ সময় বেতনহীন ছুটিতে থাকার কথা জানিয়েছেন। আর ২৬ শতাংশ বলেছেন, স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তাদের কর্মজীবন ছেড়ে দিতে হয়েছে অথবা নির্ধারিত সময়ের আগে অবসরে যেতে হয়েছে।
উচ্চ আয়ের নারীদের মধ্যেও এর প্রভাব রয়েছে। বছরে ১ লাখ ডলারের বেশি আয় করা নারীদের ১৩ শতাংশ ক্যারিয়ারের সুযোগ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। ৮ শতাংশ দীর্ঘ সময় বেতনহীন ছুটি এবং ৬ শতাংশ কর্মজীবন ছেড়ে দেয়া বা আগাম অবসরের কথা বলেছেন।
নারীর স্বাস্থ্যগত সমস্যার অর্থনৈতিক প্রভাব পরিবারেও পৌঁছাচ্ছে। চিকিৎসা নেয়ার খরচের কারণে অনেক নারী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন বা বাদ দিয়েছেন। জরিপে গত এক বছরে এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৩২ শতাংশ নারী। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, পরিবারের সদস্যদের দেখভালের দায়িত্বও নারীদের নিজেদের চিকিৎসা নেয়ার পথে বাধা তৈরি করছে। ১৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেয়ার কারণে তারা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেননি।
ফলে একজন নারীর অসুস্থতা শুধু তার নিজের কর্মক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে না; পরিবারের যত্ন, আয় এবং দৈনন্দিন দায়িত্ব পালনের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
নারীদের কর্মজীবনে স্বাস্থ্য সমস্যার প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ মেনোপজ। ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী নারীদের ৭৪ শতাংশ মেনোপজ বা পেরিমেনোপজের বর্তমান বা অতীত উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। তবে উপসর্গ থাকা নারীদের মাত্র ৫১ শতাংশ এ বিষয়ে রোগ নির্ণয় পেয়েছেন।
মেনোপজ বা পেরিমেনোপজের অভিজ্ঞতা হওয়া নারীদের এক-চতুর্থাংশের বেশি জানিয়েছেন, এ সময় তারা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেননি। ১০ শতাংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ছুটি নিতে অথবা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
অর্থাৎ নারীর জীবনের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যগত পরিবর্তনগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সহায়তার অভাব শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।
নারীর স্বাস্থ্যকে শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার বিষয় হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক প্রভাবটি পুরোপুরি বোঝা যায় না। একজন নারী অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা কমালে তাঁর ব্যক্তিগত আয় কমে। দীর্ঘ সময় কর্মের বাইরে থাকলে ক্যারিয়ার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। চাকরি ছেড়ে দিলে পরিবার হারাতে পারে একটি নিয়মিত আয়ের উৎস।
একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নারীর অনুপস্থিতি বাড়লে প্রতিষ্ঠানও দক্ষ কর্মী হারায়। দীর্ঘমেয়াদে এর সঙ্গে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ, উৎপাদনশীলতা ও আয়বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো যুক্ত হতে পারে। পিভটালের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নারীর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বাধাগুলো তাদের জীবনের সুযোগকে সীমিত করছে। তাই বিষয়টিকে শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে না দেখে কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
জরিপে ৪২ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তাঁরা জীবনে যা করতে চেয়েছেন, তার সবকিছু করতে পারেননি। চিকিৎসাসেবায় নিজেদের উপসর্গকে গুরুত্ব না দেয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে—এমন নারীদের ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি।










