আজ নিয়ে বিগত চারদিন ইউরোপের প্রায় ৩৫ কোটি ভোটার ইউরোপিয়ান সংসদে নিজেদের প্রতিনিধি পাঠাতে ভোটযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ গণতান্ত্রিক অঞ্চলটির ভোট এর অধিবাসীদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এবারের নির্বাচনে মিলেনিয়াম ভোটারসহ প্রথমবারের মতো জেন-জি ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের জরিপ বলছে, ২৫ বছরের কম বয়সী ফরাসি ও ডাচ ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশ এবং তরুণ জার্মান ভোটারদের ২২ শতাংশ দেশগুলোর ডানপন্থীদের সমর্থন দিতে পারে। ২০১৯ সালে ইউরোপিয়ান সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এ ধরনের তরুণের সংখ্যা বেড়েছে। অতি ডানপন্থী দলগুলো সংসদের মোট আসনের এক-চতুর্থাংশে জিততে পারে। ফলে সংসদে ডানপন্থীদের অবস্থান আরো শক্ত হবে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপে ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এলে পরিবেশ সংরক্ষণ, অভিবাসন, ইইউর আয়তন বৃদ্ধিসহ নানা ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে এগুলোর প্রভাব পড়বে অঞ্চলটির বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায়। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, তারা ক্ষমতাসীন হলে প্রথম তোপ দাগাতে পারে ইইউর পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির ওপর। ২০৪০ সালের মধ্যে অঞ্চলটিতে ৯০ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা বর্তমান ইইউ নীতিনির্ধারকদের। সম্প্রতি কৃষকদের প্রতিবাদের মুখে জমিতে কীটনাশকের ব্যবহারসহ বেশকিছু মৌলিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তারা। বলাই বাহুল্য, কৃষকদের ওই আন্দোলনে সুযোগ নিয়েছে ফ্রান্সের ডানপন্থী দলগুলো। তারা নিজেদের কৃষকদের লোক বলেও জাহির করেছে। 

এছাড়া ইইউর মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্রাসেলসের প্রভাব কমানোয় আগ্রহী ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী দলগুলো। এ কারণে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোর অধিক ক্ষমতা সংরক্ষণের পক্ষপাতী তারা।

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের সংসদে দেশটির অতি ডানপন্থী দল পিভিভি ক্ষমতাসীন হয়েছে। এর পরই সেখানে অভিবাসন নীতি কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির নেতা গার্ট উইল্ডার। ইউরোপীয় সংসদে ডানপন্থীদের উপস্থিতি জোরদার হলে এমন মনোভাব আরো সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইইউর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে দেশগুলো। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইইউয়ে আরো দেশ যুক্ত করার পক্ষপাতী বর্তমান ইইউ নেতারা। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনায় এতেও দ্বিমত করেন জাতীয়তাবাদী ডানপন্থীরা। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে ডান বা বামপন্থী কারোরই মত পরিবর্তন হবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। এসব সম্ভাবনা কতটা সত্যি হবে তা নির্ভর করছে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডানপন্থীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর। ইউক্রেন ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে যে মতদ্বৈধতা দেখা গেছে, তাতে দলগুলোর একই ছাতার নিচে আসাও দুরূহ। তাছাড়া নেতৃত্বের দ্বন্দ্বও ইউরোপীয় ডানপন্থী দলগুলোর ঐক্যের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। 

ঐক্য চেষ্টার বাইরে ডানপন্থীদের পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ডানপন্থী জাতীয়তাবাদীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, মূলধারা গণমাধ্যম বা গতানুগতিক রাজনীতিবিদরা কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিশেষণটি ব্যবহার করেন। অভিযোগ খানিকটা সত্যও বটে। কেননা কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ইতালির জর্জিয়া মেলোনি ভোটার টানতে সম্প্রতি মধ্যপন্থায় ঝুঁকেছেন। একই পথ অনুসরণ করে ফ্রান্সের মেরি লি পেন বা নেদারল্যান্ডসের গার্ট উইল্ডারের মতো নেতারাও তাদের কট্টর অবস্থান থেকে সরে আসছেন। ভোট ব্যাংক বাড়াতে ইউরোপের মধ্য ডানপন্থী রাজনীতিবিদরাও অভিবাসন বা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিভাষাটি ব্যবহার করেন। ফলে ডান-বামের পার্থক্য ক্রমেই ধোঁয়াশাপূর্ণ হচ্ছে।