ভারতের মুম্বাইয়ের ফোর্ট এলাকায় এক পুরনো নিও-গথিক ভবনের জরাজীর্ণ একটি অফিস থেকেই প্রকাশিত হয় ভারতের প্রাচীন ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পারসি সাময়িকী ‘পার্সিয়ানা’।

১৯৬৪ সালে পারসি চিকিৎসক পেস্টনজি ওয়ার্ডেন এই পত্রিকা শুরু করেছিলেন। মূলত মুম্বাইয়ের পারসি সমাজের খবরাখবর লিপিবদ্ধ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে পত্রিকাটি জনপ্রিয়তা ও গ্রাহকসংখ্যায় বেড়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পারসিদের জন্য এটি ছিল নিজেদের সম্প্রদায়কে জানার জানালা, সংযোগের সেতু।

তবে আগামী অক্টোবরে ৬০ বছরের পথচলার ইতি টানতে যাচ্ছে পার্সিয়ানা। গ্রাহকসংখ্যার পতন, অর্থাভাব ও উত্তরসূরি না থাকায় ম্যাগাজিনটি বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এই সংবাদ পারসি সমাজে শোকের ছায়া ফেলেছে। আগস্ট মাসে এক সম্পাদকীয়তে বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পর থেকে পাঠকরা নানা শ্রদ্ধা ও স্মৃতিচারণা পাঠাচ্ছেন। পার্সিয়ানা বন্ধের মাধ্যমে একটা যুগের অবসান হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক পাঠক।

পাঠানোয় স্মৃতিচারণায় মুম্বাইয়ের এক পাঠক লিখেছেন, ‘এত ছোট একটি সম্প্রদায়ের জীবনকে এত নিষ্ঠা ও আবেগ দিয়ে লিপিবদ্ধ করা ছিল কঠিন কাজ। কিন্তু পার্সিয়ানা সেটি করেছে।’ পাকিস্তানভিত্তিক এক পাঠক একে বলেছেন, ‘শুধু একটি প্রকাশনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জোরোয়াস্ট্রিয়ানদের মধ্যে সেতুবন্ধ।’ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক পাঠক জানিয়েছেন, ‘এটি কেবল তথ্য দেয়নি, বিতর্কিত বিষয়েও বাস্তবতার স্পর্শ এনেছে।’

১৯৭৩ সালে মাত্র এক রুপিতে পত্রিকাটি কিনে নেন জেহাঙ্গির প্যাটেল। বর্তমানে তার বয়স ৮০ বছর। শুরুতে ওয়ার্ডেনের হাতে এটি ছিল মাসিক, যেখানে মূলত প্রবন্ধ বা চিকিৎসাবিষয়ক লেখা ছাপা হতো। প্যাটেল এটিকে করেন পাক্ষিক, যোগ করেন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ব্যঙ্গাত্মক কলাম, চিত্রণ। তিনি সাংবাদিক নিয়োগ দেন, সাবস্ক্রিপশন মডেল চালু করেন, আর সাদাকালো সাময়িকীকে রঙিন রূপে রূপান্তরিত করেন। পার্সিয়ানাকে প্রকৃত সাংবাদিকতামূলক পত্রিকা হিসেবে গড়ে তোলেন জেহাঙ্গির প্যাটেল।

তার প্রথম প্রতিবেদন ছিল পারসি সমাজে উচ্চ হারের বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে—যা পাঠকদের কাছে বিস্ময়কর ছিল। ১৯৮৭ সালে তিনি প্রথম আন্তঃধর্মীয় বিয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে আলোচনার ঝড় তোলেন। অনেক পাঠক এর বিরোধিতা করলেও তিনি পিছু হটেননি।

পার্সিয়ানা বিতর্ক এড়িয়ে যায়নি কখনো। জনসংখ্যা হ্রাস, ‘টাওয়ার অব সাইলেন্স’-এর অবনতি, ধর্মীয় ও সামাজিক বিতর্ক—সবকিছুই স্থান পেয়েছে এর পাতায়। একইসঙ্গে পারসি সমাজের অর্জন, নতুন প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও নিয়মিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছর মে মাসে এটি মুম্বাইয়ের একমাত্র পারসি জাদুঘর ‘আলপাইওয়ালা মিউজিয়াম’-এর উদ্বোধনের খবর ছেপেছিল।

পত্রিকাটিকে বর্তমানে ১৫ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন, যারা প্রায় সবাই ষাটোর্ধ্ব। পত্রিকাটির যাত্রাপথের ইতি টানার বিষয়ে জানতে চাইলে প্যাটেল বলেন, এক ধরনের ক্লান্তি ও দুঃখ একসঙ্গে কাজ করছে। প্রকাশনার শেষ দিনে কোনো বড় আয়োজনের পরিকল্পনা নেই। কয়েকটি সংখ্যায় শুধু পার্সিয়ানা-র দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতিচারণ থাকবে। সহকর্মীদের সঙ্গে হয়তো অফিসে দুপুরের খাবার হবে—কোনো কেক নয়, কোনো উদযাপন নয়। প্যাটেল বলেন, ‘এটা উদযাপন বা আনন্দের দিন নয়।’