একসময় ছিল যখন ইংল্যান্ডের নাম শুনলেই ভেসে উঠত অবিরাম বৃষ্টি আর সবুজের চাদরে মোড়া দৃশ্য। অথচ সেই ইংল্যান্ড এখন ভয়াবহ পানির সংকটে। এথেন্সের দাবানলের মতোই দেশটির অনেক শহরে এখন পানির সংকট গুরুতর হুমকিতে পরিণত হয়েছে। দেশটির সরকার সম্প্রতি পানির এ সংকটময় অবস্থাকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এর অর্থ হলো—শুষ্ক আবহাওয়া যদি চলতে থাকে, তাহলে পুরো দেশই পানি শূন্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
২০২২ সালের তীব্র খরায় লন্ডনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। জলাধারগুলো শুকিয়ে গিয়েছিল, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমেছিল বিপজ্জনক পর্যায়ে। তখন জরুরি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারির কথা ভাবা হয়। যদি বৃষ্টিহীনতা আরো এক বছর স্থায়ী হতো, তবে লন্ডনের প্রতিটি ট্যাপে পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেত। এটি ছিল আসন্ন সংকটের একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা।
কিন্তু যে দেশটির ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু প্রচুর পানির যোগান দেয়, সেখানে এমন দশা হলো কীভাবে?
সংকটটির মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, পুরনো অবকাঠামো ও জনগণের উদাসীনতা। ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে মাটির নিচে নরম ও ছিদ্রযুক্ত চক শিলাস্তর বৃষ্টির পানি ছেঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানিতে পরিণত করে। আবার, উত্তরের শিলাস্তর শক্ত হলেও সেখানে বৃষ্টিপাত বেশি হয়, যা জলাধারগুলো পূর্ণ রাখে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন গ্রীষ্মকাল দীর্ঘ ও শুষ্ক হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে।

হোলিয়াকের একটি খালি সৈকতে ডেকচেয়ারে মানুষ বসে আছে, ছবি: রয়টার্স
আরেকটি বড় সমস্যা হলো অবকাঠামোতে বিনিয়োগের অভাব। ১৯ শতকে স্থাপিত লন্ডনের কিছু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো ব্যবহার করা হয়। এতে প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন লিটার পরিশোধিত পানি পাইপের লিকেজ দিয়ে নষ্ট হয়, যা মোট সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। যদিও পানি কোম্পানিগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে এ লিকেজ অর্ধেক করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবুও বছরে মাত্র দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ পাইপ প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, গত ৩০ বছরে জনসংখ্যা বাড়লেও ইংল্যান্ডে একটিও নতুন জলাধার নির্মাণ করা হয়নি।
এদিকে, ব্রিটিশ পরিবারগুলোও পানির ব্যবহার নিয়ে উদাসীন। তারা প্রতিদিন মাথাপিছু প্রায় ১৫০ লিটার পানি ব্যবহার করে, যা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ যেমন ফ্রান্স (১২৮ লিটার) বা জার্মানির (১২২ লিটার) তুলনায় অনেক বেশি। টয়লেট ফ্লাশ করা, বাগান করা বা গাড়ি ধোয়ার মতো কাজেও বিশুদ্ধ পানীয় জল ব্যবহার করা হয়। এ অপচয়মূলক ব্যবহারের কারণে এক প্রজন্ম পরের মানুষরা হয়তো অবাক হবে।
বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সংকটটি শুধু একটি ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা নয়। জলবায়ু সংকটের প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি ইংল্যান্ডের পানি, খাদ্য ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন নতুন জলাধার নির্মাণ, আধুনিক অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। অন্যথায়, চিরসবুজ ইংল্যান্ড এক শুকনো ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে যাবে।










