থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে প্রায় ৪৮ ঘণ্টার টানা ভারি বৃষ্টিতে সড়ক ও ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর শহরজুড়ে বন্যা দুর্যোগ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। কোনো কোনো এলাকায় বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে অনেক এলাকায় কোমরসমান পানি জমে যায়। সড়কে আটকা পড়ে যানবাহন। পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের।
ব্যাংককের ৫০টি জেলার সবক’টিকেই দুর্যোগকবলিত ঘোষণা করেছে ব্যাংকক মেট্রোপলিটন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিএমএ)। পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্থানীয় প্রশাসনকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট জানিয়েছেন, পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে নতুন করে বৃষ্টি না হলে জমে থাকা পানি সরাতেও দুই-তিনদিন সময় লাগতে পারে।
টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর খালসংলগ্ন বাড়ি, দোকান, রেস্তোরাঁ ও অলিগলিতে ঢুকে পড়েছে নোংরা পানি। পূর্ব ব্যাংকক ও খালপাড়ের এলাকাগুলোয় পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। অন্তত ১৩টি প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শহরের পাম্পিং স্টেশনগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। সম্মিলিতভাবে এগুলো প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ২০০ ঘনমিটার পানি সরানোর চেষ্টা করছে। তবে খালগুলো পূর্ণ থাকায় পানি নিষ্কাশন কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দেশটিতে যাওয়া বাংলাদেশী পর্যটক ও চিকিৎসাপ্রার্থীরা।
বাংলাদেশ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের পর্যটন নগরী পাতায়াতে সপরিবারে ঘুরতে যান তানভীর আহমেদ। ব্যাংককে পৌঁছার পর থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি। এরপর পাতায়া পৌঁছতেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। ঘোরাঘুরির উদ্দেশ্যে গেলেও পুরোটা সময় হোটেলেই কাটাতে হয় তাদের। প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টির মধ্যে সাগর উত্তাল থাকায় ভ্রমণ-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেননি। থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় কোহ লান দ্বীপে যাওয়ার পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয় তাদের।
পাতায়া থেকে গতকাল ব্যাংককে ফেরেন তানভীর ও তার পরিবার, ততক্ষণে শহরটির বড় একটা অংশই পানির নিচে তলিয়ে যায়। বিমানবন্দর থেকে হোটেলে ফেরার এক কিলোমিটার আগে নামিয়ে দেন গাড়িচালক। এরপর সন্তানকে কোলে নিয়ে ভারি বৃষ্টির মধ্যেই লাগেজসহ ডুবন্ত রাস্তা দিয়ে হেঁটে পৌঁছতে হয় হোটেলে।
ব্যাংককের দুর্যোগের কবলে পড়েছেন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা নিতে যাওয়া সাব্বির আহম্মেদ। গতকাল ব্যাংকক হাসপাতালে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টের নির্ধারিত তারিখ ছিল তার। দুর্যোগের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছলেও তার চিকিৎসক হাসপাতালে পৌঁছতে পারেননি। কবে চিকিৎসক তাকে দেখবেন সেই নিশ্চয়তাও গতকাল পর্যন্ত পাননি তিনি। অথচ অতিরিক্ত সময়ে ব্যাংককে থাকার ব্যয় ও ফিরতি টিকিট বাতিল করতে হয় কিনা এমন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে বড় একটি অংশ যায় ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ও চিকিৎসা নিতে। ব্যাংকক শহরে তীব্র বন্যা ও দুর্যোগে থাইল্যান্ডে থাকা বাংলাদেশীদের অনেকেই মোবাইলে তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন।
গতকাল থেকে পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টার বৃষ্টিতে ব্যাংকক শহরে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়। এতে ব্যাংকক শহরকে দুর্যোগকবলিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে নগর কর্তৃপক্ষ। সেখানকার বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাস্তাঘাট পানির নিচে পুরোপুরি তলিয়ে গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের মতো থাইল্যান্ডে ভ্রমণ ও চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশীদের বড় অংশই বিপাকে পড়েছে। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর ব্যবহারে যাত্রীদের অতিরিক্ত ৩-৪ ঘণ্টা হাতে সময় নিয়ে বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ব্যাংককের প্রধান সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনীকে ত্রাণ তৎপরতায় নামানো হয়েছে এবং বিভিন্ন স্কুলকে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে খুলে দিয়েছে থাই সরকার।
ব্যাংককের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও ভিডিও শেয়ার করেন থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (পলিটিক্যাল) সোনিয়া মুন্নী। ওই পোস্টে তিনি বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে নিজের বাসায় ফেরার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এমনকি তার পোস্টে ব্যাংককের বন্যা প্রতিরোধ কেন্দ্র কর্তৃক ছোট গাড়ির জন্য জলাবদ্ধ সাতটি রাস্তা এড়িয়ে চলার সতর্কতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তার ওই পোস্টের সঙ্গে একটি ভিডিও শেয়ার করেন দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা। যেখানে দেখা যাচ্ছে ব্যাংকক শহরের জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে ধীরগতিতে গাড়ি চলাচল করছে।
ব্যাংককে ৪৮ ঘণ্টার বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি তীব্র ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সেখানকার স্কুল-কলেজ, সরকারি প্রতিষ্ঠান, পর্যটন-রাস্তাঘাট ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। এমনকি সেখানকার সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার পূর্বাভাসও দেয়া হয়েছে। ব্যাংককে এমন বৃষ্টি-দুর্যোগ আগে কখনো দেখেননি বলে জানান সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা।
থাইল্যান্ডভিত্তিক ভ্রমণ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানবিষয়ক প্রতিষ্ঠান সিয়া নয় ফিট অ্যান্ড ফ্লাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা মাজেদুল নয়ন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টানা ৪৮ ঘণ্টার বৃষ্টিতে ব্যাংককের বেশির ভাগ এলাকা পানিতে নিমজ্জিত। ১৫টি রাস্তা চলাচলের পুরোপুরি অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ পানি সরতে পুরোপুরি দুইদিন সময় লাগবে বলে জানায় ব্যাংকক প্রশাসন। শহরের বেশির ভাগ গাড়ি চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বেশির ভাগ মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করছেন। বাংলাদেশ থেকে যারা চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য এসেছেন তারাও আটকা পড়েছে। বিশেষ করে যারা চিকিৎসা নিতে আসেন তারা চিকিৎসকের শিডিউল ও ফ্লাইট শিডিউল সেভাবেই করেন। চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেকে থাইল্যান্ডে অবস্থান ও ব্যয়ভার নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।’
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল বৃষ্টিতে ব্যাংককের বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক প্লাবিত হয়েছে। অনেক গাড়ির একটি বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে, কোথাও কোথাও পানি কোমর পর্যন্ত জমে যাওয়ায় বাসিন্দাদের পানির মধ্য দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
গতকাল ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট এক ঘোষণায় জানান, বর্তমান পরিস্থিতি মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে খালসংলগ্ন এলাকাগুলোর পরিস্থিতি বেশি গুরুতর।
থাইল্যান্ডের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, সপ্তাহ জুড়ে ব্যাংকক ও আশপাশের এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সেনাবাহিনী আশ্রয় কেন্দ্র ও অস্থায়ী রান্নাঘর স্থাপনসহ বিভিন্ন ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। ব্যাংকক মেট্রোপলিটন প্রশাসন শহরের কয়েকটি স্কুলকে সাময়িক আবাসন হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করেছে। একই সঙ্গে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসিন্দাদের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। থাই সরকার খালের আশপাশে বসবাসকারীদের জন্য জরুরি সতর্কতা জারি করে মূল্যবান জিনিসপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী উঁচু স্থানে সরিয়ে নিতে বলেছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিভিন্ন সুপারমার্কেটে নিত্যপণ্য কিনতে মানুষের ভিড় দেখা গেছে।










