স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দুর্নীতির সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে চলমান অস্তিত্বের যুদ্ধে জয় লাভের জন্য দুর্নীতির সঙ্গে লড়াইকে অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবেই প্রচার করে আসছে দেশটির সরকারি কর্মকর্তাসহ অন্যান্য অ্যাকটিভিস্টরা। সে প্রচারের ফলাফলও বেশ ভালোভাবেই দেশটিতে পাওয়া গেছে। 

দুর্নীতি রোধে কিছুটা সফলতা পেয়েছে ইউক্রেন। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ২০০৬ সাল থেকে ইউক্রেনকে তালিকার সর্বোচ্চে স্থান দিয়েছে। বর্তমানে  দুর্নীতি উপলব্ধি সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে এর অবস্থান ১০৪তম।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউক্রেনের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রি বোরোভিক বিবিসিকে বলেছেন, বেশিরভাগ ইউক্রেনীয় দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান বেশ ভালো ফল দেখাচ্ছে। ২০২৩ সালের মে মাসে ঘুসের অভিযোগে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ভেসেভোলোদ নিয়াজেভকে গ্রেফতার করা হয়। এটি দুর্নীতিবিরোধী রক্ষাকবচ হতে পারে। কারণ যখন কাউকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হতে দেখা যাবে তখন অন্য কেউ দুর্নীতি করার আগে আরেকবার ভাববে। 

ইউক্রেনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দেশটির কৃষিমন্ত্রী মাইকোলা সলস্কি এবং এসবিইউ গোয়েন্দা পরিষেবার একজন কর্মকর্তা আর্টেম শাইলোসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও গ্রেফতার হয়েছেন। 

তবে শীর্ষ নেতাদের তিনজনই নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিন নেতাই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান রয়েছে। 

ইউক্রেনে ২০১৫ সালে যখন প্রজোরো নামক একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করেছিল তখন ইউক্রেন মাত্র চার বছরে পাবলিক ফান্ডে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার সাশ্রয় করেছিল। 

বোরোভিক বলেন, ইউক্রেনের কাজ এখন তার ট্যাক্স এবং শুল্ক পরিষেবাগুলোতে দুর্নীতির মূলোৎপাটনের পাশাপাশি আর্থিক তদারকি উন্নত করার দিকে মনোনিবেশ করা।

চলমান যুদ্ধাবস্থায় দেশটিতে আসা পশ্চিমা অর্থসাহায্যের সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, পশ্চিম থেকে ইউক্রেনে প্রচুর অর্থ আসছে এবং তারা জিজ্ঞেস করছে যে এ অর্থের ওপর সঠিক নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা।

ইউক্রেনের স্বল্প সম্পদ নষ্টের পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি বৈদেশিক সাহায্যের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইউক্রেনে সহায়তা বিলম্বিত করার বিষয়ে চ্যালেঞ্জের সময় দুর্নীতির উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের জন্য আরো সৈন্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘুসের উদ্বেগের মধ্যে সামরিক নিয়োগের দায়িত্বে থাকা সমস্ত আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছিলেন। যুদ্ধে যোগদান এড়াতে ইউক্রেনের হাজার হাজার নাগরিক দেশ ছাড়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের ঘুস দিয়েছিল। 

বিশেষায়িত দুর্নীতি দমন প্রসিকিউশন সার্ভিসের ডেপুটি হেড অ্যান্ড্রি সিনিউকের মতে, ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো দেশের দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার কার্যকারিতা প্রতিফলিত করে। 

জানুয়ারি মাসে দেশটিতে সেনাবাহিনীর মর্টার ক্রয়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি উন্মোচিত হয়েছিল যা দেখিয়েছিল কোনো কিছুই দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর নাগালের বাইরে নয়। ন্যাশনাল এজেন্সি ফর প্রিভেনটিং করাপশন থেকে দিমিত্রো কালমিকভ যোগ করেন, পাসপোর্ট ইস্যুর মতো সরকারি পরিষেবাগুলোতে দুর্নীতি প্রায় নির্মূল করা হয়েছে এবং শিক্ষা ও পুলিশিংয়ে উল্লেখযোগ্য সংস্কার করা হয়েছে।

তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশটির অ্যান্টি-করাপশন পলিসির প্রধান কাল্মিকভ স্বীকার করেছেন যে ইউক্রেনীয় সরকার প্রাকৃতিক সম্পদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে কম সফল হয়েছে। তিনি এ ধীর অগ্রগতির জন্য শক্তিশালী স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর প্রভাবকে দায়ী করেন। কাল্মিকভ সামগ্রিক জনপ্রশাসনের উন্নতির জন্য আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে বিচার বিভাগীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

সাংবাদিক ইউরি নিকোলভসহ দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণাকারীরা একমত যে ইউক্রেনীয় সরকার দুর্নীতি মোকাবেলায় অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নিকোলভ পরামর্শ দেন যে সরকারের সর্বোচ্চ স্তরে মনোভাবের পরিবর্তন এবং পশ্চিমা দাতাদের চাপের কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রচেষ্টা বৃদ্ধি পেয়েছে।