মানুষের জীবন যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত ডিভাইস, স্মার্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ও চ্যাটবটে ঠাসা, তখনই শুরু হয়েছে এক নতুন ধারা। প্রযুক্তির এ অতি নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ এখন বেছে নিচ্ছে ‘এনালগ লাইফস্টাইল’ বা সেকেলে জীবনধারা। এটি কেবল কয়েক দিনের জন্য ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকা (ডিজিটাল ডিটক্স) নয়, বরং দৈনন্দিন কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের হাতে কাজ করার এক দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা।

এনালগ শখের জয়জয়কার

মানুষ এখন সৃজনশীল কাজে সময় কাটাতে পছন্দ করছে। উত্তর আমেরিকার বিখ্যাত ক্রাফটস কোম্পানি ‘মাইকেলস’ জানিয়েছে, গত ছয় মাসে তাদের ওয়েবসাইটে ‘এনালগ হবি’ লিখে খোঁজার হার ১৩৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালে হাতে কলমে কাজ করার কিট বা সরঞ্জামের বিক্রি ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। আর চলতি বছর তা আরো ৪০ শতাংশ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, উল বোনা বা নিটিংয়ের মতো ‘নানি-দাদিদের শখ’ এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়। উল বোনার কিটের খোঁজ বেড়েছে ১,২০০ শতাংশ! অনেক মানুষ এখন স্মার্টফোনে অনর্থক সময় নষ্ট (ডুমস্ক্রোলিং) না করে মানসিকভাবে শান্ত থাকতে হাতের কাজ বা সৃজনশীল শখ বেছে নিচ্ছেন।

image2-20260117224224808

সাম্প্রতিক সময়ে ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলা একটি ছবি

কেন এই পরিবর্তন?

গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআই মানুষের হয়ে চিন্তা বা কাজ করার ফলে এক ধরনের একঘেয়েমি তৈরি হয়েছে। মানুষ এখন ইন্টারনেটের কৃত্রিমতা থেকে বেরিয়ে আসল বা স্পর্শ করা যায় এমন কিছুর স্বাদ পেতে চায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই গবেষক অ্যাভরিয়েল এপস বলেন, এআইয়ে তৈরি কন্টেন্টগুলো এখন একঘেয়েমি ও মৌলিকত্বহীন হয়ে পড়েছে, যা মানুষকে ক্লান্ত করে তুলছে। আর তাই মানুষ সৃজনশীলতার কাছে ফিরছে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: ৯০-এর দশকের জীবনে ফেরা

সিএনএন-এর সাংবাদিক রামিশাহ মারুফ নিজে ৪৮ ঘণ্টার জন্য এ এনালগ জীবনধারার পরীক্ষা চালান। তিনি তার তিনটি আইফোন, ল্যাপটপ, কিন্ডল ও অ্যালেক্সাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। তার অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে:

  • সকালের পরিবর্তন: ফোনের অ্যালার্মের বদলে সূর্যের আলোয় ঘুম থেকে ওঠা ও ডায়েরি লেখা।
  • চারপাশকে চেনা: রাস্তায় হাঁটার সময় ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে না থেকে শহরের সৌন্দর্য ও আকাশচুম্বী দালানগুলো প্রাণভরে দেখা।
  • সামাজিকতা: লাইব্রেরিতে গিয়ে অন্যদের সঙ্গে বসে উল বোনা বা গল্প করা, যেখানে কারো হাতে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস নেই।

সবকিছুই কি বদলে যাচ্ছে?

এনালগ জীবন মানেই যে প্রযুক্তির সম্পূর্ণ ত্যাগ, তা নয়। অনেকে বেছে নিচ্ছেন মাঝ রাস্তা। যেমন: স্পটিফাইয়ের বদলে আইপড ব্যবহার করা, ডিজিটাল ছবির বদলে ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলা কিংবা ডিজিটাল ক্যালেন্ডারের বদলে হাতে লেখা রুটিন ব্যবহার করা।

image3-20260117223431031

স্মার্টফোনে অনর্থক সময় নষ্ট না করে পেপার ক্রাফটিং করছেন কেউ কেউ

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ২৫ বছর বয়সী শাউনেসি বার্কার নিজেকে ‘কট্টর এআই বিরোধী’ মনে করেন। তিনি বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহার করেন এবং বন্ধুদের বলেন তাকে চিঠি লিখতে। যদিও নিজের ভিন্টেজ ব্যবসার প্রচারের জন্য তাকে মাঝে মাঝে ইন্টারনেটে আসতে হয়, তবুও তিনি তার জীবনের বড় অংশ প্রযুক্তিহীন রাখার চেষ্টা করেন।