আশেপাশে এমন অনেক মানুষের দেখা পাওয়া যায় যারা কোনো রাজপরিবারে জন্ম না নিলেও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন তাদের কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরবে। সবসময় সবার মনোযোগ তাদের দিকেই থাকবে। এটি কোনো মানসিক রোগ না হলেও, নার্সিসিজম বা আত্ম-মুগ্ধতার এমন এক পর্যায়, যা আশেপাশের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘প্রিন্সেস সিনড্রোম’ বা ‘প্রিন্সেস সিকনেস’ (পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি প্রিন্স সিনড্রোম নামে পরিচিত)।

94638-ilustrasi-princess-syndrome-freepikdianagrytsku

কী এই প্রিন্সেস সিনড্রোম?

প্রিন্সেস সিনড্রোমে আক্রান্তরা নিজেকে বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত মনে করেন। তারা বিশ্বাস করেন, পরিশ্রম ছাড়াই জগতের সব সুখ-সুবিধা তাদের প্রাপ্য। অন্যেরা তাকে মধ্যমণি না ভাবলেই শুরু হয় তীব্র মানসিক সংকট। এ সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়:

  • এরা সব সময় নিজেকে নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করেন। অন্যের বড় কোনো সমস্যার চেয়ে নিজের নখের আঁচড় এদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
  • যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে না থাকলে এরা অস্থির হয়ে পড়েন এবং মনোযোগ পাওয়ার জন্য অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যান।
  • এদের চাহিদার তালিকা আকাশচুম্বী। তবে যত বেশিই দেয়া হোক না কেন, এদের সন্তুষ্ট করা প্রায় অসম্ভব।
  • কোনো গঠনমূলক সমালোচনাকেও এরা ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে ধরে নেন। ফলে প্রায়ই অন্যদের সাথে ঝগড়া বা বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।
  • বড় হয়েও এরা নিজের সমস্যার সমাধানের জন্য অন্যের ওপর (বাবা-মা বা সঙ্গী) অতি-নির্ভরশীল থাকেন।

কেন এ ‘রাজকন্যা’ মনোভাব?

এ আচরণের বীজ মূলত বপন করা থাকে শৈশবে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে দুটি প্রধান কারণে এটি হতে পারে:

অতিরিক্ত প্রশ্রয়: সন্তান বড় হওয়ার সময় যদি বাবা-মা তার সব ভালো-মন্দ আবদার চোখ বন্ধ করে মেনে নেন এবং কোনো কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে না দেন, তবে সন্তানের মধ্যে এ অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হয়।

jpg-20230228-233640-0000jpg-e5ea3b410e91d039e127c322b7ff3cff

যত্নের অভাব (ডিফেন্স মেকানিজম): এর উল্টোটাও ঘটতে পারে। শৈশবে যদি কোনো শিশু পর্যাপ্ত যত্ন বা ভালোবাসা না পায়, তবে সে নিজেকে রক্ষার জন্য এক ধরনের ‘সেলফ বুস্টিং মেকানিজম’ তৈরি করে, যা পরবর্তীতে তাকে আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে।

ফেয়ারিল্যান্ড বনাম বাস্তব

বাস্তব জীবনে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া মানেই স্বাধীনতা, সহনশীলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা। কিন্তু প্রিন্সেস সিনড্রোমে আক্রান্তরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার এ ধাপগুলোয় হোঁচট খান। তারা সম্পর্ককে সমান অংশীদারিত্বের বদলে নিজের ‘ভ্যালিডেশন’ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেন। বন্ধুদের কাছ থেকে এরা শুধু সুযোগ নিতে চান, কিন্তু বিনিময়ে কিছু দিতে নারাজ। সঙ্গীর কাছে এদের প্রত্যাশা থাকে কোনো ‘প্রিন্স চার্মিং’ এসে তাদের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে। এই এক-পাক্ষিক মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে চরম তিক্ততা নিয়ে আসে।

উত্তরণের উপায়

যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিদ ন্যান্সি আরভিন মনে করেন, এ সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের বড় হওয়ার প্রক্রিয়া। তাই প্রতিকার শুরু হতে হবে ঘর থেকেই:

  • পরিশ্রমের প্রশংসা: সন্তানদের শুধু তাদের চেহারা বা বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা না করে, তাদের কঠোর পরিশ্রমের প্রশংসা করুন।
  • সম্বোধনে সতর্কতা: অযথাই ‘প্রিন্সেস’, ‘গডেস’ বা ‘ডিভা’র মতো বিশেষণে শিশুদের ভাসিয়ে দেবেন না। এতে তাদের মধ্যে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হওয়ার ভুল ধারণা তৈরি হয়।
  • দায়িত্বশীলতা শেখানো: ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস এবং অন্যের প্রতি সহমর্মী হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।
  • সীমানা নির্ধারণ: বন্ধু বা সঙ্গী হিসেবে এদের সব আবদার প্রশ্রয় না দিয়ে নিজস্ব ‘বাউন্ডারি’ তৈরি করতে হবে এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করতে হবে।